বইপড়ার সংস্কৃতি বিকাশে সরকারি অনুদান পাওয়ার কথা যেসব পাঠাগারের, বাস্তবে তার অনেকগুলোই বঞ্চিত। অন্যদিকে, কাগজে-কলমে থাকা অস্তিত্বহীন বা 'ভূতুড়ে' পাঠাগারের নামে বছরের পর বছর সরকারি অর্থ ও বইয়ের অনুদান নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে যশোরে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, যশোরের বিভিন্ন উপজেলায় এমন একাধিক পাঠাগার রয়েছে, যেগুলোর বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। তবুও ২০১৮ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নিয়মিত সরকারি অর্থ ও বইয়ের অনুদান পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা এলাকাবাসীও এসব পাঠাগারের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
এর মধ্যে চৌগাছা উপজেলার 'হাউলি যুব গ্রন্থাগার' অন্যতম। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাঠাগারটির কোনো সাইনবোর্ড, ভবন বা বইয়ের সংগ্রহ নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তারা কখনও এ নামে কোনো পাঠাগারের কথা শোনেননি।
যশোর জেলায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর এবং জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের তালিকাভুক্ত ও নিবন্ধিত বেসরকারি পাঠাগারের সংখ্যা ৬২টি। এর মধ্যে চৌগাছায় ১৫টি, যশোর সদরে ১২টি, অভয়নগরে ৯টি, মনিরামপুরে ৬টি, বাঘারপাড়ায় ৫টি, শার্শায় ৪টি, কেশবপুরে ৩টি এবং ঝিকরগাছায় ২টি পাঠাগার রয়েছে।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের নীতিমালা অনুযায়ী পাঠাগারগুলোকে 'ক', 'খ' ও 'গ'—এই তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে বার্ষিক অনুদান দেওয়া হয়। অনুদানের ৫০ শতাংশ নগদ অর্থ এবং বাকি ৫০ শতাংশ সমমূল্যের বই হিসেবে দেওয়া হয়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে যশোর জেলার ২১টি পাঠাগার মোট ১২ লাখ ৩৭ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত পাঠাগার পেয়েছে ৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা এবং অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান পেয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।
তবে অনুদানপ্রাপ্ত ২১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১২টি নিবন্ধিত। বাকি ৯টি অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানও সরকারি অনুদান পেয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে কন্দর্পপুর গণগ্রন্থাগার, স্বামী বিবেকানন্দ গণপাঠাগার, কুয়দা পাবলিক লাইব্রেরি, আলোর পথে গণপাঠাগার, চাঁদপাড়া গণগ্রন্থাগার, আহম্মদ স্মৃতি পাঠাগার, কবি শিমুল আজাদ গণগ্রন্থাগার, বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুল মালেক স্মৃতি পাঠাগার এবং হাউলি যুব গ্রন্থাগার।
সরেজমিনে হাউলি যুব গ্রন্থাগারের দাবিদার সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালামের বাড়িতে গিয়ে পাঠাগার দেখতে চাইলে তিনি পাশের একটি ঘর দেখান। কিন্তু সেখানে একটি পরিবার ভাড়া থাকছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া বই কিংবা পাঠাগারের নিজস্ব কোনো বইও তিনি দেখাতে পারেননি।
স্থানীয় ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আলী কদর বলেন, "আমি এই ওয়ার্ডের নির্বাচিত সদস্য। আমার এলাকায় 'হাউলি যুব গ্রন্থাগার' নামে কোনো পাঠাগার আছে বলে জানি না। আজ সাংবাদিকদের কাছেই প্রথম এ নাম শুনলাম।"
অন্যদিকে একই উপজেলার ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বাড়ীয়ালী যুব পাঠাগার দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত পাঠচর্চা পরিচালনা করে আসছে। পাঠাগারটিতে বর্তমানে ২২ হাজারের বেশি বই রয়েছে এবং প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ জন পাঠক সেখানে বই পড়তে আসেন।
পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ মন্টু বলেন, "যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন আমরা 'ক' শ্রেণির স্বীকৃতি পাইনি। বছরের পর বছর অনুদানের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। অথচ অস্তিত্বহীন পাঠাগারগুলো নিয়মিত অনুদান পাচ্ছে।"
যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার হক বলেন, "তদন্তে কোনো পাঠাগারের অস্তিত্ব না পাওয়া গেলে বা ভুয়া তথ্য দিয়ে অনুদান নেওয়ার প্রমাণ মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি অর্থের অপব্যবহার কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।"
প্রতিনিধি/আরএইচ