পরিবহন শ্রমিকদের আকস্মিক সড়ক অবরোধে বৃহস্পতিবার বিকেলে কার্যত অচল হয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকা। বিকেল ৪টার দিকে মহাখালীতে শুরু হওয়া অবরোধের জেরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গুলশান, বনানী, তেজগাঁও, ফার্মগেট, মগবাজার, কাকলী ও বিমানবন্দর সড়কসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র যানজট ছড়িয়ে পড়ে। অফিস ছুটির সময় এ অবরোধে লাখো মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন; অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনে আটকে থাকতে বা দীর্ঘ পথ হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়।
অফিস ছুটির সময় আকস্মিক এ অবরোধে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ যাত্রীরা। অনেককে দীর্ঘ সময় বাসে আটকে থাকতে দেখা যায়। কেউ কেউ বাস থেকে নেমে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে হেঁটে রওনা দেন। ফলে মহাখালী, বনানী ও তেজগাঁও এলাকায় ফুটপাতেও সৃষ্টি হয় মানুষের উপচেপড়া ভিড়।
অবরোধকারী শ্রমিকদের দাবি, সম্প্রতি সড়ক পরিবহন খাতে নেওয়া কয়েকটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বিভিন্ন স্থানে যানবাহনের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান, জরিমানা বৃদ্ধি, লাইসেন্স ও কাগজপত্র সংক্রান্ত জটিলতা এবং শ্রমিকদের বিরুদ্ধে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন পেশাগত দাবি দ্রুত বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানান তারা।
শ্রমিক নেতারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দাবি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়েই তারা সড়কে নেমেছেন। অবরোধে অংশ নেওয়া এক শ্রমিক বলেন, "আমরা দিনের পর দিন নানা সমস্যার কথা বলছি। কিন্তু কেউ আমাদের কথা শুনছে না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।"
এদিকে অবরোধ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মহাখালী ফ্লাইওভার, আমতলী, বনানী, কাকলী ও গুলশান-১ পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, মগবাজার, বাংলামোটর, শাহবাগ ও বিমানবন্দরমুখী সড়কেও। অনেক বাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও পণ্যবাহী যান ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে। কোথাও কোথাও বিকল্প সড়ক ব্যবহার করেও যানজট এড়ানো সম্ভব হয়নি। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা যান চলাচল স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করলেও অবরোধের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হয়।
অবরোধের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন অফিস শেষে বাড়ি ফেরা মানুষ। দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থেকে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. রাশেদ বলেন, "বিকেল সাড়ে ৪টায় অফিস থেকে বের হয়েছি। দুই ঘণ্টা পার হলেও মহাখালীই পার হতে পারিনি। কোনো ঘোষণা নেই, বিকল্প ব্যবস্থাও নেই। সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম বলেন, "পরীক্ষা শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। বাস এক ঘণ্টা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। পরে হেঁটেই বনানী পর্যন্ত এসেছি।" এক নারী যাত্রী বলেন, "সঙ্গে ছোট বাচ্চা ছিল। গরমে বাসের ভেতরে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বাধ্য হয়ে নেমে হাঁটতে হয়েছে।"
এসমায় একজন বয়স্ক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যে দাবিই থাকুক, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে আন্দোলন কখনো সমাধান হতে পারে না।"
এক বাসচালক বলেন, "আমরা নিজেরাও আটকে আছি। যাত্রীদের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কেউ ভাড়া ফেরত চাইছে, কেউ নেমে যাচ্ছে।" এক ট্রাকচালক বলেন, "ঢাকার বাইরে পণ্য নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। এখন কখন বের হতে পারব, সেটাই জানি না। এতে ব্যবসায়ীদেরও ক্ষতি হচ্ছে।"
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা
অবরোধের খবর পেয়ে পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তারা শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সড়ক থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে দ্রুত যান চলাচল স্বাভাবিক করা যায়।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি থাকলে সরকারকে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে আন্দোলনের নামে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যেকোনো ধরনের অবরোধের প্রভাব পুরো নগরজুড়ে পড়ে। তাই শ্রমিক সংগঠন, মালিকপক্ষ ও সরকারের মধ্যে দ্রুত সংলাপের মাধ্যমে সংকট নিরসন জরুরি। তা না হলে একই ধরনের পরিস্থিতি আবারও নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগে ফেলতে পারে।
দেশবার্তা/এমআর