ডিজিটাল আর্থিক খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের সহজ বিচরণের কারণে বাংলাদেশ অনলাইন প্রতারণা চক্রের অন্যতম প্রধান টার্গেট ও হটজোন হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি কম্বোডিয়া, লাওস বা ভিয়েতনামের মতো দেশে সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চলায় আন্তর্জাতিক এই চক্রটি এখন নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। সম্প্রতি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বিদেশ অনলাইন প্রতারক চক্রের দুটি বড় আস্তানা উন্মোচন করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের দ্রুত বিস্তার,অপর্যাপ্ত সাইবার নিরাপত্তা এবং যাচাইকরণ ব্যবস্থার অভাব, আকর্ষণীয় 'ডিজিটাল লোন' স্ক্যাম, জনগণের মাঝে সচেতনতার অভাব, সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সচেতনতা কম থাকায় প্রতারকরা সহজেই এসব দেশে ফাঁদ পাতার চেষ্টা চালায়।
র্যাব ও পুলিশ সূত্র জানায়,এই চক্রটি মূলত বাংলাদেশী আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহার করে ওয়েবসাইট হ্যাকিং, অনলাইন জুয়া,ক্যাসিনো এবং ভুয়া চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বিশাল প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করছিল।
পুলিশের দাবি, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শুরুতে একটি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকাতে ১১৮ গ্রাম কোকেন পাঠানোর একটি ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ মহসীন নামে এক ব্যক্তির সন্ধান পায়। মাদক মামলায় তাঁকে ৫ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করার পর পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদে চট্টগ্রামের ওই গোপন আস্তানায় অবস্থানরত ৬৩ জন অনলাইন প্রতারক বিদেশীর সন্ধান মেলে।
গ্রেপ্তার মহসিনের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলায় হলেও তিনি নগরের কর্ণফুলী এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। সে চট্টগ্রামের খুলশীতে বিদেশীদের জন্য বাসা ভাড়া করে দেয়। তাদের পাসপোর্টও নিজের জিম্মায় রাখে। মহসীনের সাথে স্থানীয় আর কারা করা জড়িত তা অনুসন্ধানে নেমেছে আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মুহাম্মদ ফয়সাল আহমেদ দেশবার্তাকে বলেন, প্রতারক চক্র বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সংঘবদ্ধভাবে অনলাইন প্রতারণা, সাইবার জালিয়াতি ও অবৈধ অর্থ আত্মসাৎ করে আসছিল।
চট্টগ্রামের ওই গোপন আস্তানায় অবস্থানরত ৬৩ জন অনলাইন প্রতারক বিদেশীর কাছ থেকে জব্দকৃত ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপসহ প্রায় ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের মেরিনা বিচ ভিলাস নামের একটি রিসোর্টেও ৬টি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ তৈরি করে আরেকটি চক্রটি কাজ করছিল। অভিযানের খবর পেয়ে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন বিদেশী নাগরিক (চীনা ও তাইওয়ানিজ) পেছনের সৈকত দিয়ে পালিয়ে যায়।রিসোর্ট থেকে বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামসহ ১টি চক্রকে আটক করা হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোঃসাখাওয়াত হোসেন দেশবার্তাকে বলেন,প্রতারকেরা মানুষের 'বিশ্বাস' এবং 'লোভ'—এই দুটি মানসিক আবেগকে পুঁজি করে। অল্প পুঁজিতে দ্বিগুণ লাভ, ঘরে বসে পার্ট-টাইম বা টেলিগ্রামভিত্তিক চাকরি, বিদ্যুৎ বিল কমানোর চটকদার অফার, কিংবা রোমান্স স্ক্যাম এর মাধ্যমে মানুষের মানসিক দুর্বলতার সুযোগ নেয়।
বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়া ও প্রতারণা চক্র স্থানীয়দের সহায়তায় দেশীয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা পাচার করছে।
দেশবার্তা/জেএ