রাজশাহীর চারঘাটে বাংলাদেশ রেলওয়ের বৈধ বরাদ্দ পাওয়া এক চা দোকানিকে আটকে রেখে দোকান ভাঙচুর ও মারধরের হুমকি দিয়ে তিনটি ফাঁকা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক টিপসই নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে।
অভিযুক্ত ওই ব্যক্তির নাম মো. জাহাঙ্গীর আলম (জাহাঙ্গীর মাস্টার)। তিনি হলিদাগাছি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, চারঘাট শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চারঘাট উপজেলার শলুয়া ইউনিয়ন শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ভুক্তভোগী দীন মোহাম্মদ চারঘাট উপজেলার চামটা গ্রামের মৃত সেফাত মন্ডলের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হলিদাগাছি রেলগেট এলাকায় একটি টিনের ছাপড়া দোকানে চা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।
প্রাপ্ত তথ্য ও নথিসূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে গত ৯ জুলাই ২০২৪ তারিখে হলদিগাছি মৌজার জেএল নং-১৪, দাগ নং-১৮৫-এর অন্তর্ভুক্ত ১০×১০ অর্থাৎ ১০০ বর্গফুট জায়গা দীন মোহাম্মদের নামে বিধিমোতাবেক বরাদ্দ দেওয়া হয়। দীন মোহাম্মদ বিগত ৮–৯ বছর ধরে ওই স্থানে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চা বিক্রি করছেন।
দীন মোহাম্মদ অভিযোগ করে জানান, মাসখানেক আগে বাজারের নাইটগার্ডের মাধ্যমে জাহাঙ্গীর মাস্টার তাঁকে তাঁর ব্যক্তিগত চেম্বারে (পশুখাদ্য ও কীটনাশকের দোকানে) বৃষ্টির মধ্যে রাত সোয়া ১১টার দিকে ডেকে পাঠান। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, ভেতরে আরও ১০–১৫ জন লোক উপস্থিত রয়েছেন।
এ সময় জাহাঙ্গীর মাস্টার রেলের জায়গায় দোকান বসানোর অজুহাত তুলে দীন মোহাম্মদের কাছে নিয়মিত মাসিক ভাড়া দাবি করেন। দীন মোহাম্মদ নিজের বৈধ বরাদ্দ ও দারিদ্র্যের কথা জানালে জাহাঙ্গীর মাস্টার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং দোকান ভাঙচুরসহ শারীরিক নির্যাতনের হুমকি দেন।
একপর্যায়ে প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে তিনটি ১০০ টাকার ফাঁকা স্ট্যাম্পে তাঁর জোরপূর্বক টিপসই নেওয়া হয় এবং দোকান থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। স্ট্যাম্পগুলোতে পরবর্তীতে কী লেখা হয়েছে, তা তাঁর জানা নেই বলে জানান দীন মোহাম্মদ।
ঘটনার পর দীন মোহাম্মদ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য ও গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি অবহিত করেন এবং প্রতিকার দাবি করেন। বর্তমানে তাঁর পরিবার জানমালের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, জাহাঙ্গীর মাস্টার দীর্ঘদিন ধরে দলীয় পদ ও শিক্ষক সমিতির প্রভাব খাটিয়ে হলিদাগাছি রেলস্টেশন এলাকার বিভিন্ন ক্ষুদ্র দোকান থেকে অবৈধভাবে চাঁদা ও ভাড়া আদায় করে আসছেন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মাদক কারবার, পুকুর দখল, সালিশ-বৈঠকে অর্থের বিনিময়ে পক্ষপাতিত্ব এবং নারীদের দিয়ে স্থানীয় লোকজনকে ব্ল্যাকমেইল করার মতো গুরুতর অপকর্মে তাঁর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয়দের দাবি, তাঁর মতের বাইরে গেলেই অনুসারী ক্যাডার বাহিনী এবং থানার কতিপয় অসাধু পুলিশ সদস্যের মাধ্যমে নিরীহ মানুষকে মিথ্যা মামলা ও হয়রানির ভয় দেখানো হয়। এমনকি নিজ দলীয় নেতাদের ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
চারঘাট থানা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ইসমাইল অভিযোগ করে বলেন, “জাহাঙ্গীর মাস্টার বিভিন্ন দোকানপাট ও স্থাপনা থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলেন এবং দখল বাণিজ্যে লিপ্ত। মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গেও তাঁর যোগসাজশ রয়েছে। এর আগে তিনি দলবল নিয়ে আমার বাড়িতেও হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছিলেন।”
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি বাজার কমিটির সভাপতি হিসেবে সালিশ বৈঠক করে দিয়েছিলাম। সেখানে সবাই উপস্থিত ছিলেন। আমার বিরুদ্ধে একটি মহল ষড়যন্ত্র করে আমার ইমেজ নষ্ট করার চেষ্টা করছে।”
এ বিষয়ে চারঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জানান, “দীন মোহাম্মদ নামে কারও পক্ষ থেকে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। কারও সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটে থাকলে থানায় এসে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করলে বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
প্রতিনিধি/আরএইচ