কনডেম সেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে জন্ম। জন্মের পর থেকেই মায়ের সঙ্গে সেখানেই কেটেছে জীবনের সাড়ে সাতটি বছর। পৃথিবীর আলো, মুক্ত আকাশ, স্বজনের ভালোবাসা কিংবা স্বাভাবিক শৈশব-এসবের সঙ্গে পরিচয় হয়নি ছোট্ট রাথির।
অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে বের হওয়ার পর স্বজন ও গণমাধ্যমকর্মীরা তাকে ঘিরে ধরলেন। গলায় পরিয়ে দিলেন ফুলের মালা। কেউ জানতে চাইলেন নানা কথা, কেউ বললেন হাসতে। কিন্তু রাথি হাসেনি। হয়তো যে শিশুটি কনডেম সেলের গণ্ডির মধ্যেই বড় হয়েছে, সে স্বাভাবিক জীবনের সেই হাসিটাই কখনো শেখার সুযোগ পায়নি।
জন্মের আগে মায়ের কষ্ট আর কান্না, আর জন্মের পর কারাগারের কঠোর পরিবেশ—এই দুই বাস্তবতার মধ্যেই বেড়ে উঠেছে রাথি। সাড়ে সাত বছরে কত মানুষ তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছেন, কতজন তাকে আপন করে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন—তার হিসাব হয়তো রাথির নিজের কাছেও নেই।
কারাগার থেকে বের হয়ে রাথি অপলক দৃষ্টিতে চারপাশের পৃথিবী দেখছিল। তার চোখেমুখে ছিল বিস্ময়। যেন হঠাৎ করেই সে প্রবেশ করেছে সম্পূর্ণ নতুন এক পৃথিবীতে। যে মেয়েটির জীবনের শুরুটাই হয়েছে কারাগারের দেয়ালের ভেতর, মুক্ত আকাশ তার কাছে তাই নিঃসন্দেহে এক নতুন অভিজ্ঞতা।
শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর বিকাশে জন্মের পরের পরিবেশ, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, খেলাধুলা ও স্বাভাবিক সামাজিক মেলামেশার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গর্ভকালেও শিশুর শ্রবণ ও স্নায়ুবিক বিকাশ ধীরে ধীরে ঘটে এবং মায়ের কণ্ঠসহ বাইরের বিভিন্ন শব্দের সঙ্গে পরিচয় তৈরি হতে থাকে। ফলে রাথির মতো দীর্ঘ সময় কারাগারের সীমাবদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ও সামাজিক অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন রাথির মা কামরুন নাহার মনি। সেই মামলায় হাইকোর্টের রায়ে মনি খালাস পাওয়ার পর দীর্ঘ সাড়ে সাত বছর পর কনডেম সেলের জীবন থেকে মুক্ত হলো রাথিও।
গত ২৪ আগস্ট ২০২৬ হাইকোর্ট নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং ১০ আসামিকে খালাস দেন। ওই রায়ের পর কামরুন নাহার মনি বেকসুর খালাস পেলে মায়ের সঙ্গে রাথির জীবনেও আসে মুক্তির নতুন অধ্যায়।
আজ রাথি মুক্ত আকাশের নিচে। মায়ের হাত ধরে কারাগারের অন্ধকার পেরিয়ে সে ফিরেছে স্বাভাবিক জীবনের পথে। কিন্তু এই সাড়ে সাত বছরে হারিয়ে যাওয়া তার শৈশব কে ফিরিয়ে দেবে? সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, এই বয়সে রাথির দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী হওয়ার কথা। অথচ তার শিক্ষাজীবন থেকে কেটে গেছে প্রায় আড়াই বছর। যে বয়সে একটি শিশুর বই-খাতা, স্কুল, বন্ধু আর খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সে রাথির ঠিকানা ছিল কারাগারের কনডেম সেল।
মুক্তির আনন্দের পাশাপাশি তাই রাথির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা, শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাওয়া এবং ভালোবাসা ও নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠা। রাথি হয়তো আজও হাসতে শেখেনি। তবে মুক্ত আকাশের নিচে তার নতুন জীবনের শুরু হোক-একদিন যেন সেই হাসি সত্যিই ফিরে আসে।
দেশবার্তা/জেএ