ডেঙ্গু, হাম, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, নগর তাপ ও অনিরাপদ পানির মতো জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় নগর পরিকল্পনাকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংস্থাটি বলেছে, জনস্বাস্থ্য শুধু চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার বিষয় নয়; একটি শহরের ভূমি ব্যবহার, ড্রেনেজ, জলাশয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আবাসনের ঘনত্ব ও খোলা জায়গার পরিকল্পনার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
আজ শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘হাম ও ডেঙ্গু: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নগর পরিকল্পনার ভূমিকা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বিআইপির সভাপতি ও পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম।
ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, সংকট দেখা দেওয়ার পর জরুরি চিকিৎসা ও তাৎক্ষণিক সাড়াদানে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হলেও অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, দুর্বল নিষ্কাশনব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও টিকাদান কার্যক্রমের ঘাটতির মতো মূল কারণগুলো অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। রোগের প্রাদুর্ভাবের পর প্রতিকারের পাশাপাশি ঝুঁকি তৈরির আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ডেঙ্গুতে ৭৯ হাজারের বেশি হাসপাতালে ভর্তি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য তুলে ধরে বিআইপির সভাপতি বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে সারা দেশে ডেঙ্গুতে ৭৯ হাজার ৬২০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা গেছেন ২৪৫ জন। ২০২৫ সালে সারা বছরে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ৪১৩ জন। অর্থাৎ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার আগেই গত বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
তিনি বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মে মাসের প্রাক্-বর্ষা জরিপে ৬৩টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ড ছিল সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে। ২ হাজার ২৩৮টি বাড়ি পরিদর্শন করে ২৮১টিতে এডিস মশার লার্ভা বা পিউপা পাওয়া যায়।
বিআইপি বলছে, এসব পজিটিভ বাড়ির ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ ছিল বহুতল ভবন এবং ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ নির্মাণাধীন ভবন। নির্মাণাধীন ভবন, বেজমেন্ট, লিফটের গর্ত ও ছাদে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। তাই ভবন নির্মাণের অনুমোদনের শর্তে পানি জমা প্রতিরোধ ও বেজমেন্ট ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করা এবং নির্মাণস্থলে নিয়মিত লার্ভা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
হামের ঝুঁকিতেও নজর দেওয়ার আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে হামের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিআইপির সভাপতি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ১৫ মার্চ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩১টি সন্দেহভাজন এবং ২১ হাজার ৫২০টি নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হাম-সম্পর্কিত ১ হাজার ১০৮টি নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু ও হামের ঝুঁকির ধরন এক নয়। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জমে থাকা পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু ও নির্মিত পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে হামের ক্ষেত্রে টিকা কভারেজের ঘাটতি প্রধান ঝুঁকি। তবে ঘনবসতি, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ ও নজরদারির ঘাটতিও সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় টিকাদান কেন্দ্র স্থাপন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ টিকাদানের জন্য স্থান নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছে বিআইপি।
জলাবদ্ধতা-বায়ুদূষণেও পরিকল্পনার ঘাটতি
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জলাশয় ও বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল হারানো, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। জলাবদ্ধতার পানি পয়োনিষ্কাশনের সঙ্গে মিশলে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন অবকাঠামোর সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
বায়ুদূষণ ও নগর তাপ নিয়েও উদ্বেগ জানায় বিআইপি। সংস্থাটির মতে, সড়ক ও নির্মাণস্থলের ধুলা, যানবাহনের নির্গমন, ইটভাটা, শিল্পকারখানা এবং বর্জ্য পোড়ানো বায়ুদূষণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অন্যদিকে জলাশয় ও সবুজ এলাকা কমে গিয়ে নির্মিত এলাকার বিস্তার নগর তাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
এ অবস্থায় সবুজ ও নীল অবকাঠামো, হাঁটার উপযোগী পরিবেশ, গণপরিবহন এবং খোলা জায়গা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
স্বাস্থ্যকে নগর পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় লক্ষ্য করার আহ্বান
জনস্বাস্থ্যকে নগর পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বিআইপি বলেছে, বড় নগর প্রকল্পে স্বাস্থ্য প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তথ্যভিত্তিক মানচিত্র তৈরি, ড্রেনেজ ও পানি ব্যবস্থার সমন্বয় এবং নিম্ন আয়ের ও অনানুষ্ঠানিক বসতিকে পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
ডেঙ্গু ও হামের ঝুঁকি, জলাবদ্ধতা, জনঘনত্ব, টিকা কভারেজ, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও তাপ ঝুঁকির তথ্য জিআইএসের মাধ্যমে একত্রে বিশ্লেষণ করে উচ্চঝুঁকির এলাকা চিহ্নিত করার পরামর্শ দিয়েছে বিআইপি।
সংস্থাটি বলেছে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় নগর পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার, ওয়াসা, রাজউক, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির সহসভাপতি ও পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান, কোষাধ্যক্ষ ও পরিকল্পনাবিদ আবু ছালেহ মো. শহীদুল্লাহ, বোর্ড সদস্য (মেম্বারশিপ অ্যাফেয়ার্স) ও পরিকল্পনাবিদ সাদী মো. হারুন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
দেশবার্তা/এমআর