বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সরকার ও দলের ভাবমূর্তি সুরক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এ ক্ষেত্রে পদ-পদবি কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
এরই মধ্যে দলীয় সিদ্ধান্তে সাংগঠনিক ব্যবস্থার মুখে পড়েছেন কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। নজরদারিতে রয়েছেন আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও দলীয় নেতা। তাঁদের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত চলছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বুধবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সময়ে বিলুপ্ত করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি। এর পরদিন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের বিষয়টি সামনে আসে। বৃহস্পতিবার দুপুরে এ খবর প্রকাশিত হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর এমন কঠোর অবস্থানের খবরে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা চলছে।
বিএনপির একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। অপরাধের অভিযোগ ওঠার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোন পদে রয়েছেন, তা বিবেচনার বিষয় হবে না। বরং অভিযোগের প্রকৃতি ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের আরও কয়েকজন নেতাকর্মীর নামও আলোচনায় আসে।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন শেষে ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন। ঘটনার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের পর বুধবার থেকে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দখল, চাঁদাবাজি এবং দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অনিয়মে জড়িত নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে বিতর্কিত নেতাদের কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার এ প্রক্রিয়ায় আরও কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকেও সতর্ক করা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত কাউকে সাংগঠনিক সুরক্ষা দেওয়া হবে না বলে হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, ‘বিএনপি দেশ ও জনগণের জন্য রাজনীতি করে। সেখানে যদি কেউ বিশৃঙ্খলা করে, তাহলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের দলের কিছুসংখ্যক উচ্চাভিলাষী নেতাকর্মী শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন; যারাই অপরাধ করবেন, তাদের কোনো পরিচয় দেখা হবে না-কঠোর হস্তে দমন করা হবে।’
সাম্প্রতিক দখল, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, অপরাধী যে-ই হোক, কোনো রাজনৈতিক ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
গত কয়েক দিনে রাজধানীতে কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা ও মামলা ঘিরে বিএনপির ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দলের কিছু নেতাকর্মীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্যপ্রমাণও বিএনপির চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানের বার্তা দেন তারেক রহমান।
এর ধারাবাহিকতায় বুধবার ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সঙ্গে উত্তর যুবদল ও পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। অনৈতিক ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কারের কথাও জানিয়েছে বিএনপি। তবে যুবদলের পক্ষ থেকে উত্তর মহানগর কমিটি বিলুপ্তির কারণ হিসেবে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ছাত্রদলও পশ্চিম মহানগর কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর যখন দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হচ্ছিল, তখন ঢাকার কয়েকটি ঘটনা সেই অর্জন কিছুটা হলেও ম্লান করেছে। তবে তারেক রহমানের কাছে দেশ, দল ও সরকারের ভাবমূর্তি সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এ কারণে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
দলীয় সূত্র জানায়, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলাসহ ঢাকা মহানগর উত্তরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা চলছে। বুধবার মহানগর নেতাদের সঙ্গে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকেও নিয়ে বৈঠক করেন বিএনপির চেয়ারম্যান। ওই বৈঠকে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া এসব ঘটনায় সরকারি দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী নেতার ইন্ধনের অভিযোগও তারেক রহমানের নজরে আনা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
দলীয় শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদেরও ছাড় দেওয়া হবে না বলে বার্তা দেওয়া হয়েছে।
সরকার ও বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং দলীয় নেতাকে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান। তাঁদের বিরুদ্ধে এলাকায় দখলদারি, প্রভাব বিস্তার ও দলীয় কোন্দলে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি অন্তত চারজন প্রতিমন্ত্রীর কাছে এসব বিষয়ে কারণ জানতে চেয়েছেন সরকারপ্রধান।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, সরকার গঠনের পর দলীয় নেতাকর্মীদের আচরণের গুরুত্ব বেড়েছে। তাঁদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব সরাসরি সরকারের ওপর পড়ছে। তাই দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, এমন কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
দলীয় সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, সরকার গঠনের পর থেকে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সহস্রাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বহিষ্কার, পদ স্থগিত, অব্যাহতি ও কারণ দর্শানোর নোটিশ।
এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে। দলীয় দপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁদের মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি নেতাকে বিভিন্ন পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
দলীয় সূত্র জানায়, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, জমি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ এবং সালিশ বা দরবারের নামে হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও দলের কাছে জমা পড়া অভিযোগগুলোও যাচাই করা হচ্ছে।
সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। জুলাইয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নির্বাচন সামনে রেখে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। দলীয় ইউনিটগুলো সক্রিয় করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। এ অবস্থায় শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়াকে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে দেখছেন দলের নেতারা। বিশেষ করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলোয় নতুন নেতৃত্ব আনার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
দলের একাধিক নেতা বলেন, ক্ষমতায় থাকলে সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করতে হয়। কারণ, নেতাকর্মীদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রভাব সরাসরি সরকারের ওপর পড়ে। এ কারণে ব্যক্তির পরিচয়ের চেয়ে অপরাধের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পাবে।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, শুধু নেতাকর্মীদের নয়, একই সঙ্গে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও জনগণকে বিএনপি মেসেজ দিতে চায়-দলীয় পরিচয় কিংবা প্রভাব এখানে বড় নয়, সবাইকে আইনের আওতায় আসতে হবে। ভবিষ্যতে কেউ অন্যায় কর্মকাণ্ডে জড়ালে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না, তার বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনায় মেজর (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের স্কুলশিক্ষক গোলাম কিবরিয়া লালনকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সম্মানের সঙ্গে ছেড়ে দিয়ে পুলিশ তাঁকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সবার জন্য একই বার্তা দেওয়া হয়েছে- যে যত প্রভাবশালী হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আসতে হবে। বিশৃঙ্খলা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তথ্যসূত্র: যুগান্তর
দেশবার্তা/একে