নওগাঁর রাণীনগরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখার দুই কর্মীকে মারধর করে ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যাংকের তিন কর্মীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, অনলাইন জুয়ায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হেরে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ এবং পরে ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন ওই তিন কর্মী। তাঁদের মধ্যে অফিস সহায়ক রাসেল বাবু নিজেকে ভুক্তভোগী সাজিয়ে ঘটনার ছক তৈরি করেন। এ ঘটনায় ছিনতাই হওয়া ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা, একটি মোটরসাইকেল ও সাতটি মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম। তাঁর দিকনির্দেশনায় জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও রাণীনগর থানা পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত দল তিন দিনের অভিযানে নওগাঁ, জয়পুরহাট ও দিনাজপুরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন রাণীনগর উপজেলার বিশিয়া গ্রামের আব্দুল জব্বারের ছেলে স্বপন (২৮), একই গ্রামের ওয়াজেদের ছেলে হাসান আলী (২৫), অলংকারদীঘি গ্রামের ইদ্রিস আলীর ছেলে সুজন (২৭), সিমলাদার গ্রামের আব্দুল ওহাবের ছেলে আবু তালেব (২২), অলংকারদীঘি গ্রামের আব্দুল মজিদের ছেলে রাসেল বাবু (২২) এবং মোটরসাইকেলের মালিক রাব্বি আলী। সুজন, আবু তালেব ও রাসেল বাবু ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারী।
পুলিশ সুপার জানান, গত ৬ অক্টোবর দুপুরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখার ক্যাশিয়ার নাজমুল ও অফিস সহায়ক রাসেল বাবু আদমদীঘি রেলগেট থেকে ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে মোটরসাইকেলে করে শাখার মালিক ফিরোজ হোসেনের আবাদপুকুর বাজার শাখার দিকে যাচ্ছিলেন। বেলা ১টার দিকে রাণীনগর উপজেলার পারইল বাজার পেরিয়ে বাংলালিংক টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাঁদের পথরোধ করে। এরপর লোহার রড দিয়ে মারধর করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পরপরই তদন্তে নামে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও রাণীনগর থানা পুলিশ। তথ্য-প্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার প্রাথমিক সূত্র পাওয়ার পর ওই রাতেই অভিযান চালিয়ে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত নিবন্ধনহীন মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয়। এ সময় মোটরসাইকেলের মালিক রাব্বি আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সুপার আরও জানান, ৭ অক্টোবর রাতে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর ও দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে স্বপন ও হাসান আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে ছিনতাই হওয়া ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৮ অক্টোবর রাণীনগর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ব্যাংকের কর্মকর্তা সুজন, আবু তালেব ও অফিস সহায়ক রাসেল বাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সুপার বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, ব্যাংকের অফিস সহায়ক রাসেল, কর্মকর্তা সুজন ও আবু তালেব কয়েক মাস ধরে অনলাইন জুয়া খেলে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হারান। পরে তাঁরা বিভিন্ন গ্রাহকের টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে অনলাইন জুয়ায় ব্যবহার করেন। সেই টাকা হারানোর পর এজেন্ট ব্যাংকের মালিক ফিরোজ হোসেনের টাকা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন তাঁরা। এ কাজে স্বপন, হাসানসহ আরও কয়েকজনকে যুক্ত করা হয়। প্রায় এক মাস ধরে তাঁরা পরিকল্পনা করেন।
তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন রাসেল বাবু ক্যাশিয়ার নাজমুলকে সঙ্গে নিয়ে টাকা আনতে যান। পথে তাঁরা কোথায় আছেন, তা রাসেল স্বপন, হাসানসহ পলাতক সহযোগীদের জানাতে থাকেন। নির্ধারিত স্থানে পৌঁছালে স্বপন, হাসান ও তাঁদের সহযোগীরা দুজনকে আটকে মারধর করে টাকা নিয়ে পালিয়ে যান। ক্যাশিয়ার নাজমুলই ছিলেন প্রকৃত ভুক্তভোগী। তাঁকে লোহার পাইপ দিয়ে মারধর করা হয়। অন্যদিকে, টাকা বহনকারী রাসেল বাবু নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে সাজিয়েছিলেন বলে জানায় পুলিশ।
পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, ছিনতাই হওয়া ৩৪ লাখ টাকার মধ্যে ব্যাংকের তিন কর্মীর ১০ লাখ টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। বাকি টাকা অন্য ছিনতাইকারীদের মধ্যে ভাগ হওয়ার কথা ছিল। স্বপন ও হাসানকে প্রাথমিকভাবে দেড় লাখ টাকা দিয়ে নওগাঁ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বলা হয়। পরে তাঁরা জয়পুরহাট হয়ে দিনাজপুরে চলে যান।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান পুলিশ সুপার।
এদিকে আবাদপুকুর ইসলামী ব্যাংক এজেন্ট শাখার স্বত্বাধিকারী ফিরোজ হোসেন বলেন, “আমি বিশ্বাস করে তাদেরকে চাকরি দিয়েছিলাম। তারাই আমার চরম ক্ষতি করল। তবে পুলিশ সুপার খুব দ্রুত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এখন শুধু এসপি স্যারের প্রতি অনুরোধ থাকবে আমার ছিনতাই হওয়া টাকা যেন দ্রুত উদ্ধার করে। তাছাড়া আমার বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি আশা করি এসপি স্যার খুব দ্রুত টাকাগুলো উদ্ধার করতে সক্ষম হবেন।”
সংবাদ সম্মেলনে নওগাঁর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) জিন্নাহ আল মামুন, জেলা গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক (ওসি ডিবি) হাসিবুল্লাহ হাসিব, নওগাঁ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান, রাণীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকারিয়া মণ্ডলসহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিনিধি/আরএইচ