যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং তীব্র জনবল সংকটের কারণে পর্যটননগরী কক্সবাজারের দৃষ্টিনন্দন আইকনিক রেলস্টেশনটির সৌন্দর্য ও অবকাঠামো নষ্ট হতে শুরু করেছে। উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও নানা জটিলতায় এখনও স্টেশনটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিশাল এই স্থাপনার আধুনিক সুযোগ-সুবিধাগুলো সাধারণ মানুষের উপকারে আসছে না।
কক্সবাজারের ঝিলংজা ইউনিয়নে ২১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৯ একর জায়গার ওপর ঝিনুক আকৃতির ছয়তলা বিশিষ্ট ১ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুটের এই আইকনিক রেলস্টেশনটি নির্মাণ করা হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বরে উদ্বোধনের পরের মাসেই নতুন এই রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দেশের রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয় পর্যটননগরী কক্সবাজার।
স্টেশনটিতে তারকা মানের হোটেল, শপিংমল, রেস্তোরাঁ, শিশুযত্ন কেন্দ্র এবং লাগেজ রাখার লকারসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। দৈনিক ৪৬ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত এই স্টেশনটি শুধু যাতায়াতের কেন্দ্র নয়, পর্যটননগরীর প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে গত দুই বছরে পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাবে স্টেশনের বিভিন্ন ফিটিংসে ধুলোর আস্তর জমেছে এবং কাঠামোর বেশ কিছু অংশে মরিচা ধরতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও ফিটিংস খুলে পড়ারও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিম্নমানের কাজ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশাল এই স্টেশন কমপ্লেক্সটি পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ জনবল প্রয়োজন, বর্তমানে তার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ কর্মী রয়েছে। নতুন এই রুটের জনবল এখনো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় অত্যন্ত সীমিত সামর্থ্য নিয়ে জোড়াতালি দিয়ে চলছে স্টেশনের কার্যক্রম। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকলেও তা পরিচালনার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না থাকায় পুরো স্টেশন এখনো পুরোপুরি উন্মুক্ত করা যায়নি।
প্রাথমিকভাবে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে প্রতিদিন ৩১ জোড়া ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা থাকলেও বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে মাত্র পাঁচ জোড়া ট্রেন চলাচল করছে।
প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের অনুমোদন না মেলায় আইকনিক স্টেশনটি পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। কিন্তু প্রথম দফার দরপত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান সাড়া না দেওয়ায় শর্ত শিথিল করে দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়।
পূর্বের শর্তে লোকবল নিয়োগ, পুরো স্টেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়ের শর্তে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হতো। ১২ বছরের চুক্তিতে এই বিনিয়োগ উঠে আসা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। পাশাপাশি অফেরতযোগ্য অগ্রিম ও পারফরম্যান্স গ্যারান্টির ২০ কোটি টাকা আটকে রাখার শর্তেও তাদের আপত্তি ছিল।
প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় শর্ত শিথিল করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। নতুন শর্ত অনুযায়ী, অফেরতযোগ্য অগ্রিম ৫ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১ কোটি টাকা, পারফরম্যান্স সিকিউরিটি ১৫ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৫ কোটি টাকা এবং চুক্তির মেয়াদ ১২ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্ব অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম পিইঞ্জ বলেন, পর্যাপ্ত লোকবল থাকলে আমরাই স্টেশনটি পরিচালনা করতে পারতাম। সাধারণত বড় বড় প্রকল্প নেওয়ার সময় জনবল ধরা হয় না। জনবল না পাওয়ায় কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, দ্বিতীয় দফায় বেসরকারি অপারেটর নিয়োগের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং ঠিকাদারদের পরামর্শ অনুযায়ী শর্তও শিথিল করা হয়েছে। এবার অপারেটর নিয়োগ পাওয়া যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। তবে এবারও অপারেটর নিয়োগ সম্ভব না হলে সভায় প্রস্তাব উত্থাপন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
দেশবার্তা/একে