কাজ হারানোর ভয়ে জরায়ু কেটে ফেলছেন ভারতের নারী শ্রমিকরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

বিশ্ব

পরিবারের ঋণ শোধ করতে প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত আখ কাটার কাজ করেন ভারতের হাজারো নারী। মাসিকের ব্যথা, গর্ভাবস্থা

2026-10-23T16:55:54+06:00
2026-10-23T16:55:54+06:00
শনিবার ● ২৪ অক্টোবর ২০২৬,
৮ কার্তিক ১৪৩৩
 ইপেপার   আর্কাইভ   ভিডিও 
চলমান বার্তা:
বিশ্ব
কাজ হারানোর ভয়ে জরায়ু কেটে ফেলছেন ভারতের নারী শ্রমিকরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৪:৫৫ পিএম 
⏲
সংগৃহীত ছবি
পরিবারের ঋণ শোধ করতে প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত আখ কাটার কাজ করেন ভারতের হাজারো নারী। মাসিকের ব্যথা, গর্ভাবস্থা কিংবা গর্ভপাতের পরও তাঁদের কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। এক দিন কাজে যেতে না পারলেও মজুরি কাটা যায়, এমনকি শ্রমিক ঠিকাদারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। এই পরিস্থিতিতে কাজ চালিয়ে যাওয়া ও উপার্জন নিশ্চিত করতে অনেক নারী জরায়ু কেটে ফেলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচারের কথা ভাবছেন। কেউ কেউ অস্ত্রোপচার করিয়েও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের বিদ জেলার আখশ্রমিক নারীদের এমন পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আনুমানিক ১৫ লাখ মানুষ আখ কাটার কাজ করেন। তাঁদের বড় একটি অংশ মৌসুমি শ্রমিক। কাজের সন্ধানে নিজেদের এলাকা ছেড়ে দূরবর্তী আখখেতে গিয়ে তাঁরা কয়েক মাস ধরে অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করেন। সেখানে অনেক ক্ষেত্রে শৌচাগার ও সুপেয় পানির পর্যাপ্ত সুবিধাও নেই।

কর্ণাটকের প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা রামনালে পূর্ণিমা নামের এক নারী শ্রমিকের দিন শুরু হয় ভোর চারটায়। তাঁবু থেকে বেরিয়ে দিনের কাজের প্রস্তুতি নিতে হয় তাঁকে। পুরুষেরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই নারী শ্রমিকেরা হাত-মুখ ধুয়ে কাজে যাওয়ার জন্য তৈরি হন। ঋণ শোধ ও পরিবারের ভরণপোষণের জন্য নিজেদের গ্রাম থেকে পাঁচ শ কিলোমিটারের বেশি দূরে গিয়ে কাজ করতে হয় তাঁদের।

সাধারণত স্বামী-স্ত্রী জুটি বেঁধে আখ কাটেন এসব শ্রমিক। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করে তাঁদের প্রায় ৪০০ রুপি মজুরি মেলে। কাজের মধ্যে সামান্য বিরতি পাওয়া যায় মূলত ট্রাকে আখ বোঝাই করার সময়। বিশ্বে উৎপাদিত আখের প্রায় ১৬ শতাংশ ভারত থেকে আসে। উৎপাদনের দিক থেকে ব্রাজিলের পরই দেশটির অবস্থান। ভারতের আখ সরবরাহ করা হয় কোকা-কোলা ও পেপসিকোর মতো আন্তর্জাতিক কোমল পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সরবরাহব্যবস্থায়ও।

বিদ জেলার বহু শ্রমিক পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন আখ কাটা। স্থানীয়ভাবে এসব শ্রমিক দম্পতিকে ‘কয়তা’ বলা হয়। প্রতি বছর ঠিকাদারেরা চিনি কলের সঙ্গে যোগাযোগ করে শ্রমিক সংগ্রহ করেন। কাজ শুরুর আগে তাঁদের অগ্রিম অর্থ দেওয়া হয়, যা স্থানীয়ভাবে দাদন নামে পরিচিত। সেই অর্থ পরিশোধের দায় মাথায় নিয়েই শ্রমিকদের কাজে নামতে হয়।

প্রতিটি দম্পতির কাছ থেকে দিনে গড়ে অন্তত তিন টন আখ কাটার প্রত্যাশা করা হয়। দলের সবার আয় একসঙ্গে ভাগ হওয়ায় একজন কাজের গতি কমালে অন্যদের ওপরও চাপ পড়ে। কেউ অসুস্থ হয়ে কাজ করতে না পারলে তাঁর ঘাটতি পূরণে অন্যদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। এ জন্য অসুস্থ শ্রমিকের কাছেও অর্থ দাবি করা হতে পারে।

এই ব্যবস্থায় নারীদের জন্য মাসিকের সময় বিশ্রাম নেওয়াও কঠিন। ঋতুস্রাবের সময় তীব্র ব্যথা, গর্ভাবস্থা কিংবা গর্ভপাতের পরও তাঁদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়। এক দিন কাজ বন্ধ রাখলে মজুরি হারানোর পাশাপাশি ঠিকাদারকে অর্থ দেওয়ার চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে শরীরের ক্ষতি জেনেও কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হন অনেকে।

পূর্ণিমা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অসহ্য ব্যথা সহ্য করছেন তিনি। ভারী জিনিসপত্র তোলা বন্ধ করতে পারলে হয়তো তাঁর শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালো হতো। কিন্তু কাজ না করলে পরিবারের খরচ চালানো এবং ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। গত তিন বছর ধরে যন্ত্রণা সহ্য করার পর তিনিও জরায়ু কেটে ফেলার কথা ভাবছেন। অস্ত্রোপচারের খরচ মেটাতে তাঁকে আবার ঋণ নিতে হবে বলে জানান তিনি।

সবিতা নামের আরেক নারী শ্রমিক ২০২৫ সালের মার্চে অসহ্য শারীরিক কষ্টের মধ্যে জরায়ু কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ভাষ্য, আখখেতে অসুস্থ হলে সাহায্য করার মতো কেউ থাকেন না। বিশ্রামের সুযোগও মেলে না। পেটে তীব্র ব্যথা নিয়েও তাঁকে কাজ করতে হয়েছে। ট্রাকে আখ বোঝাই করতে মই বেয়ে ওপরে উঠতে গিয়ে গত বছর তিনবার পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। তারপরও কাজ বন্ধ করার সুযোগ পাননি।

অস্ত্রোপচারের পর কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সবিতার রক্তপাত বন্ধ হয়নি। পেটের ব্যথাও আগের চেয়ে বেড়েছে। পরে পুনে শহরে চিকিৎসা নিতে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানান। অস্ত্রোপচারের আগের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি দেখতে চাইলেও তিনি তা পাননি বলে অভিযোগ করেন।

সবিতা বলেন, চিকিৎসকদের বিশ্বাস করে তিনি অস্ত্রোপচারে রাজি হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, জরায়ু কেটে ফেললে সব যন্ত্রণা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পরও তাঁকে অসহ্য ব্যথার মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। অস্ত্রোপচারের আগে সম্ভাব্য জটিলতা সম্পর্কে তাঁকে সতর্ক করা হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

নারী অধিকারকর্মীদের মতে, অনেক নারী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে জরায়ু অপসারণের মতো বড় অস্ত্রোপচারের দিকে ঝুঁকছেন। তাঁদের অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে কম খরচে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার বদলে নারীদের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানো হয়। সেখানে যথাযথ চিকিৎসাগত কারণ ছাড়াই অস্ত্রোপচার করা হয়ে থাকতে পারে।

নারী অধিকারকর্মী সঙ্গীতা চৌহান ও রাজনীতিবিদ নীলম গোরহে দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে কাজ করছেন। ২০১৯ সালে নীলম গোরহের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিদ জেলায় অপ্রয়োজনীয় জরায়ু অপসারণের উচ্চ হার উঠে আসে। সঙ্গীতা চৌহানের দাবি, কিছু আশাকর্মী জরায়ু অপসারণের জন্য রোগীদের সুপারিশ করার বিনিময়ে অর্থ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে মহারাষ্ট্রের আশাকর্মীরা দ্য ইনডিপেনডেন্টের কাছে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ওয়াদওয়ানি এলাকার আশাকর্মী গঙ্গা শেবন্তেও অস্ত্রোপচারের জন্য রোগী পাঠিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ নাকচ করেছেন।

২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকার বিদ জেলার ৮২ হাজার ৩০৯ জন নারী আখশ্রমিকের ওপর জরিপ চালায়। এতে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে ১৩ হাজার ৮৬১ জনের জরায়ু অপসারণ করা হয়েছে। অস্ত্রোপচার করা নারীদের ৪৫ শতাংশের বেশি পরবর্তী সময়ে শারীরিক কিংবা মানসিক নানা সমস্যা ও যন্ত্রণার কথা জানান।

জরিপের পর মহারাষ্ট্র সরকার জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার পর্যবেক্ষণ এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেয়। ২০২৫ সালের মার্চে বোম্বে হাইকোর্টও আঞ্চলিক সরকারকে শ্রমিকদের নিবন্ধন, কল্যাণমূলক সুবিধা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একাধিক নির্দেশ দেন। ওই বছরের নভেম্বরে হালনাগাদ তথ্যসহ প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও তা প্রকাশিত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

শ্রমিকদের ভাষ্য, সরকারি উদ্যোগের সুফল তাঁরা এখনো পাননি। পূর্ণিমা ও সবিতা দুজনেই জানিয়েছেন, তাঁরা সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা পাননি।

অন্যদিকে ঠিকাদারদের দাবি, তাঁরা কাউকে অস্ত্রোপচার করাতে বাধ্য করেন না। তবে শ্রমিকদের বেতনসহ ছুটি দেওয়ার ব্যবস্থাও নেই। ঠিকাদার আশরুবা দত্ত বলেন, তাঁদের আয় নির্ভর করে কারখানায় কত ওজনের আখ সরবরাহ করা যাচ্ছে তার ওপর। শ্রমিক কম থাকলে অন্যদের দিয়ে ঘাটতি পূরণ করাও কঠিন।

কোকা-কোলা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা সলিডারিডাডের সঙ্গে যৌথভাবে তারা শ্রমিকদের সুপেয় পানি, শৌচাগার, ছায়াযুক্ত বিশ্রামাগার, আরামদায়ক যন্ত্রপাতি ও নারী স্বাস্থ্যসামগ্রী পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এ উদ্যোগে ইতিমধ্যে এক লাখ মানুষ উপকৃত হয়েছেন। এ বিষয়ে পেপসিকোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

পূর্ণিমার শারীরিক যন্ত্রণা এখনো অব্যাহত। ব্যথার চিকিৎসায় এক বছরে তাঁর প্রায় ৫০ হাজার রুপি খরচ হয়েছে। তিনি বলেন, গ্রামে ফিরে তাঁকে অস্ত্রোপচার করাতে হতে পারে, কিন্তু সে জন্যও নতুন করে ঋণ নিতে হবে। তাঁর আশঙ্কা, পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে নিজের শরীরের ওপরই চরম মূল্য দিতে হচ্ছে তাঁকে।

দেশবার্তা/এসআইএস/একে


সর্বশেষ সংবাদ 

প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিবের স্টাফ পরিচয়ে প্রতারণা, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার
ফ্রান্সজুড়ে আবারও বিক্ষোভের প্রস্তুতি
মেসিকে সর্বকালের সবচেয়ে সফল ফুটবলারের স্বীকৃতি দিল স্পেন
স্বামীর ভালোবাসার আলিঙ্গনে পাঁজরের ৫ হাড় ভেঙে গেছে স্ত্রীর
এখন আন্দোলনের কাজ নেই, দেশ গড়ার সময়: খাদ্যমন্ত্রী

সর্বাধিক পঠিত 

বরুড়া পৌরসভায় পাগলা কুকুরের আতঙ্ক, আহত ২৫ জন
আহম্মদ গ্রুপের অত্যাচার থেকে বাচতে কৃষক ইব্রাহীমের সংবাদ সম্মেলন
সাজেকে গোলাগুলি, আটকা পড়েছে কয়েক হাজার পর্যটক
সাজেকে পর্যটকসহ গুলিবিদ্ধ ৭ জনকে সেনাবাহিনীর উদ্ধার
বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ৩.৭৭ বিলিয়ন ডলার সরকারের প্রত্যাশা
বিশ্ব- এর আরো খবর 
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক অফিস: গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম একে খন্দকার সড়ক, মহাখলী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১২।
www.thedailydeshbarta.com
Mobile: 01816-185722, Email: [email protected]
Advertisement