গাজীপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক থেকে প্রায় দেড় বছর আগে চুরি হওয়া বিপন্ন প্রজাতির দুটি ‘রিঙ-টেইলড’ বা ডোরাকাটা লেজের লেমুর ভারতে পাচার হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চুরি হওয়া প্রাণী দুটি বর্তমানে ভারতের গুজরাটের একটি বেসরকারি বন্যপ্রাণী উদ্ধার, সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে রয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন।
তবে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনের মতো প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণের অভাবে সেগুলো বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এদিকে এ ঘটনায় ভারতের মুম্বাইয়ের শিল্পপতি আম্বানি পরিবারের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে সিআইডি সূত্রে জানা গেছে। আম্বানি পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা এ সংক্রান্ত অভিযোগকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
গাজীপুর সাফারি পার্ক সূত্রে জানা গেছে, কয়েকটি লেমুর দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকার পর ২০২২ সালের শুরুর দিকে একটি প্রাণী হঠাৎ মারা যায়। এরপর ২০২৫ সালের মার্চে অবশিষ্ট তিনটি লেমুর একসঙ্গে চুরি হয়ে যায়। এর মধ্যে এক মাসের মাথায় ঢাকার একটি বাসা থেকে একটি লেমুর উদ্ধার করে পার্কে ফিরিয়ে আনা হলেও সেটি কিছুদিন পর মারা যায়।
সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান জানান, লেমুর সাধারণত একা থাকে না, দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। দীর্ঘদিন নিঃসঙ্গ থাকার কারণে প্রাণীটির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।
চুরির ঘটনার বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ওই সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আউটসোর্সিংয়ে কয়েকজন কর্মী পার্কে কাজ করতেন। তাঁদের একজনের সহযোগিতায় একটি চক্র লেমুর চুরির ঘটনা ঘটিয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
সিআইডি জানায়, চুরির পর আউটসোর্সিং কর্মীসহ চক্রটির আট সদস্যের মধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে- মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে চুরি হওয়া তিনটি লেমুরের মধ্যে দুটি চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। একাধিক হাত ঘুরে প্রাণী দুটি বর্তমানে গুজরাটের ওই পুনর্বাসন কেন্দ্রে পৌঁছেছে।
তবে প্রাণী দুটি বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে- তা প্রমাণে জটিলতা তৈরি হয়েছে সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছে চুরি হওয়া লেমুরগুলোর ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন না থাকায়।
পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তারেক রহমান জানান, চুরি হওয়া লেমুর দুটির রক্তের সম্পর্কের অন্য একটি লেমুরের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে, যা আশার একটি দিক হতে পারে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, পাচার হওয়া লেমুর দুটি বাংলাদেশ থেকে গেছে, তা প্রমাণ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রাণীগুলোর আগের জেনেটিক প্রোফাইল বা ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনের সঙ্গে নতুন পরীক্ষার ফলাফল মিলিয়ে দেখা একটি বিজ্ঞানসম্মত ও কার্যকর পদ্ধতি।
এই ঘটনা বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থার দুর্বলতা ফুটিয়ে তুলেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে সাফারি পার্ক ও চিড়িয়াখানায় আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার, মাইক্রোচিপ বা ট্যাগ ব্যবহার এবং দক্ষ কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহের ওপরই এখন লেমুর দুটি দেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নির্ভর করছে।
দেশবার্তা/একে