বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বে বাইরের বিনিয়োগ টানার ফিফা প্রস্তাব ঘিরে সম্প্রতি বয়কটের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। পরবর্তীতে তাদের সেই কঠোর অবস্থানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায় উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ-ও।
ফিফা শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থান থেকে পিছু হটলেও ‘বিশ্বকাপ বর্জন’-এর মতো চরম সিদ্ধান্ত ফুটবলাঙ্গনে নতুন কিছু নয়। ফুটবলের সর্ববৃহৎ এই আসরকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সাংগঠনিক বিরোধ কিংবা বৈষম্যের প্রতিবাদে একাধিকবার বিশ্বকাপ বয়কটের ঘটনা ঘটেছে ইতিহাসে।
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম বড় ধরনের বর্জনের ঘটনা ঘটে ১৯৩৪ সালে। ১৯৩০ সালের প্রথম আসরের আয়োজক ও চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে ইতালিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বিশ্বকাপে অংশ নিতে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানায়। মূলত ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম আসরে অনেক ইউরোপীয় দেশ দীর্ঘ পথ ভ্রমণের অজুহাতে অংশ নেয়নি। চার বছর পর ইতালিতে অনুষ্ঠিত আসরটি বয়কট করে তারই এক ধরনের বদলা নেয় লাতিন আমেরিকার দেশটি।
পরের আসরেই অর্থাৎ ১৯৩৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপে দেখা যায় একই নাটকের পুনরাবৃত্তি। এবার বর্জনকারীর তালিকায় নাম লেখায় আর্জেন্টিনা। সেবার টুর্নামেন্টটি দক্ষিণ আমেরিকার মাটিতে আয়োজনের তীব্র দাবি জানিয়েছিল তারা। তবে দাবি উপেক্ষা করে ফ্রান্সকে আয়োজক হিসেবে বেছে নেওয়ায় চরম ক্ষুব্ধ হয়ে নাম প্রত্যাহার করে নেয় আলবিসেলেস্তারা।
১৯৫৮ সালের বাছাইপর্বে রাজনৈতিক সংঘাতের ছায়া পড়ে ফুটবল মাঠে। মধ্যপ্রাচ্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জের ধরে ইসরায়েলের বিপক্ষে মাঠে নামতে সরাসরি মানা করে দেয় তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মিসর ও সুদান। ফলে বাছাইপর্বে একটি ম্যাচ না খেলেই মূল পর্বের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায় ইসরায়েল। যদিও পরবর্তীতে প্লে-অফে ওয়েলসের কাছে হেরে মূল আসরে যাওয়ার স্বপ্নভঙ্গ হয় তাদের।
ফিফার বরাদ্দে তীব্র বৈষম্যের প্রতিবাদে সবচেয়ে বড় আন্দোলন গড়ে উঠেছিল ১৯৬৬ বিশ্বকাপের আগে। আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের (ক্যাফ) আওতাধীন ১৫টি দেশ একযোগে বাছাইপর্ব থেকে সরে দাঁড়ায়। তাদের ক্ষোভের মূল কারণ ছিল- ইউরোপকে একাই ১০টি স্পট দেওয়া হলেও আফ্রিকা, এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলের সব দেশের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল মাত্র ১টি টিকিট!
সবচেয়ে নাটকীয় ও বিতর্কিত বয়কটের সাক্ষী ১৯৭৩ সালের বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব। চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে সান্তিয়াগোতে গিয়ে প্লে-অফ খেলতে অস্বীকৃতি জানায় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। ফিফা খেলার ভেন্যু ও সূচি পরিবর্তন না করায় ঘটে এক আজব ঘটনা। চিলির খেলোয়াড়েরা প্রতিপক্ষ ছাড়াই খালি মাঠে খেলতে নামেন। রেফারি হুইসেল দেওয়ার পর ফাঁকা জালে একটি গোল করার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই চিলিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়!
ইতিহাসের এসব ঘটনা প্রমাণ করে, ফুটবল কেবল ৯০ মিনিটের মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি- রাজনীতি, সাংগঠনিক কোন্দল এবং প্রতিনিধিত্বের অধিকার আদায়ের লড়াইও যুগে যুগে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই খেলাকে।
দেশবার্তা/একে