ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত ২৫০ কিলোমিটার এলাকায় চালু হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা। মহাসড়কের দুই পাশে স্থাপিত এক হাজার ৪২৭টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে যানবাহনের গতিসীমা লঙ্ঘন, অবৈধ পার্কিং, উল্টো পথে চলাচলসহ বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করা হবে। শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট যানবাহনের নিবন্ধিত মালিকের মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে মামলার তথ্য পাঠানো হবে এবং নির্ধারিত মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে জরিমানার অর্থ পরিশোধের সুযোগ থাকবে।
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাট হাইওয়ের মনিটরিং সেন্টার থেকে এই স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থার উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। হাইওয়ে পুলিশ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মহাসড়কে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক আইন প্রয়োগের এই কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হয়।
হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন করা প্রকল্পটি ২০১৮ সালের অক্টোবরে শুরু হয় এবং গত বছরের ৩০ জুন শেষ হয়। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৪৪ কোটি ২১ লাখ ২১ হাজার টাকা। পরে ১৪২ কোটি ৩৬ লাখ ৮৯ হাজার টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজি লিমিটেডকে।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কের দুই পাশে মোট ৪৯০টি খুঁটির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বুলেট ক্যামেরা, পিটিজেড ডোম ক্যামেরা, লং ভিশন ক্যামেরা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চেকপয়েন্ট ক্যামেরা। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে।
নতুন এই ব্যবস্থায় কোনো যানবাহন ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলে তা ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের নম্বর শনাক্ত করে অপরাধের ধরন নির্ধারণ করা হবে। এরপর নিবন্ধিত মালিকের মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে মামলার তথ্য ও আইনগত ব্যবস্থার বিষয়টি জানানো হবে। নির্ধারিত মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে জরিমানার অর্থ পরিশোধ করা যাবে।
হাইওয়ে পুলিশ বলছে, স্বয়ংক্রিয় এই ব্যবস্থা চালুর ফলে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের সময় পুলিশ ও সাধারণ মানুষের সরাসরি যোগাযোগ কমে আসবে। এতে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। পাশাপাশি ঘুষ বা দুর্নীতির সুযোগ কমার পাশাপাশি জরিমানার অর্থ দ্রুত সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এই ব্যবস্থার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি তথ্যকেন্দ্র ও পাঁচটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মেঘনাঘাটে স্থাপন করা হয়েছে তথ্যকেন্দ্র। আর হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তর, কাঁচপুর হাইওয়ে থানা, হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপারের কার্যালয়, দাউদকান্দি হাইওয়ে থানা এবং বারআউলিয়া হাইওয়ে থানায় পাঁচটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের দাবি, মহাসড়কে ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতা বাড়ানো, যান চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আইন লঙ্ঘন শনাক্ত ও পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে সড়কে নিয়ম মানার প্রবণতা বাড়বে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, উপমহাদেশে এই প্রথম এমন একটি ব্যবস্থা চালু হয়েছে, যেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। ক্যামেরায় যানবাহনের নম্বর শনাক্ত হওয়ার পর অপরাধের ধরন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুঠোফোনে বার্তা পাঠানো হবে। এর মাধ্যমে চালক বা মালিক আইন লঙ্ঘনের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত ব্যবস্থার বিষয়ে জানতে পারবেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ও সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান, সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ফারুক আহমেদ।
দেশবার্তা/একে