বাংলাদেশ রেলওয়ের ৩০০০, ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভের সার্ভিসিং ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। লোকোমোটিভের ওয়ারেন্টি মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় তিন বছর পর প্রচলিত প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ না করে শুধু লোকোমোটিভ প্রস্তুতকারী একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সার্ভিস কন্ট্রাক্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সাধারণত তালিকাভুক্ত বৈদেশিক সরবরাহকারী ও তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের ভিত্তিতে লোকোমোটিভের বিভিন্ন স্টক ও নন-স্টক মালামাল সংগ্রহ করে থাকে। দীর্ঘদিনের এই পদ্ধতির পরিবর্তে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তির উদ্যোগ নেওয়ায় রেলওয়ের প্রচলিত ক্রয়ব্যবস্থা ও প্রতিযোগিতার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের সরাসরি সার্ভিস কন্ট্রাক্টের ফলে রেলওয়ের তালিকাভুক্ত ও নিবন্ধিত সরবরাহকারীরা প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এতে সেবা ও যন্ত্রাংশ সংগ্রহে ব্যয় বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একাধিক যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলে সেবা ও যন্ত্রাংশের মূল্য তুলনামূলকভাবে কমানোর পাশাপাশি মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। বিপরীতে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করা হলে বাজারদর যাচাই ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রচলিত প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়পদ্ধতি এড়িয়ে সরাসরি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সার্ভিস কন্ট্রাক্ট করার উদ্যোগ সরকারি ক্রয়ের স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও ব্যয়-সাশ্রয়ের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এদিকে লোকোমোটিভ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সাথে সার্ভিস কন্ট্রাক্টের ফলে যথাসময়ে যন্ত্রাংশ সরবরাহ না পাওয়ায় সময়মতো মেরামত করা কঠিন হয়ে পড়ছে, যাত্রীসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে চরমভাবে। ফলে সার্ভিস কন্ট্রাক্টের পথ থেকে সরে এসে স্থানীয় ঠিকাদারের মাধ্যমে উন্মুক্ত দরপত্র অনুসরণ করে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করার আহবান জানিয়েছে স্থানীয় সরবরাহকারীরা।
বিষয়টি আমলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারী সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) বাংলাদেশ রেলওয়ে স্পেয়ার্স এন্ড এক্সোসরিজ সাপ্লাইয়ার্স এসোসিয়েশন সম্প্রতি একটি আনঅফিসিয়াল আবেদন পাঠিয়েছেন। আবেদনের অনুলিপি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, সচিব, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক, রেলভবনের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) এবং চট্টগ্রাম রেলওয়ের সিসিএসের কাছে পাঠানো হয়েছে।
বিশেষ সূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানকে বিনা টেন্ডারে উচ্চ দরে কাজ দিতে রেলের কতিপয় লোভী কর্মকর্তার সাময়িক লাভের কবলে জিম্মিদশার দিকে এগুচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। যেখানে স্থানীয় তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীরা ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে বিদেশি যন্ত্রাংশ সরবরাহ করতে পারেন সেখানে কন্ট্রাক্ট সার্ভিসে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ১৮ মাসের সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এরফলে যথাসময়ে লোকোমোটিভ আউটার্ন করতে হিমশিম খাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, ২০২০ সালে ৩০০০ সিরিজ ইঞ্জিন সরবরাহ করার ৬ বছরেও যন্ত্রাংশের ড্রয়িং ও পার্ট নাম্বার সরবরাহ করেনি প্রগ্রেস রেল নামের সরবারাকারী প্রতিষ্ঠান।
এছাড়াও সার্ভিস পিড়িয়ডের ৩ বছর নিয়মিত সার্ভিস না দেওয়ার কারণে সময়মতো সচল রাখতে পারেনি ইঞ্জিনগুলো। আবারো সার্ভিস কন্ট্রাক্টে গেলে সেবা পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পার্ট নাম্বার সরবরাহ না করায় বিকল্প সোর্স থেকে যন্ত্রাংশ সরবরাহ করাও ঝুঁকি মনে করছেন অনেকে।
আবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের বহুল আলোচিত ও সমালোচিত ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভের (ইঞ্জিন) স্পেয়ার পার্টস বা মালামাল ক্রয়ে প্রচলিত উন্মুক্ত দরপত্র বা তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নির্দিষ্ট একটি সরবরাহকারীর সাথে সার্ভিস কন্ট্রাক্ট করার সিদ্ধান্তের আর্থিক প্রভাব এবং নিয়ম-নীতির লংঘনের করা হচ্ছে।
অন্তবর্তী সরকারের সময়ে রেলকে ধ্বংস করার জন্য একটি স্বার্থান্বেষী মহল অতি উৎসাহী হয়ে ইঞ্জিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির মাধ্যমে সার্ভিস কন্ট্রাক্ট এর কনসেপ্ট উপস্থাপন করে। যার ফলে সাতবার পিছানোর পর দাখিলকৃত ডিজেল স্পেয়ার্স এনলিস্টমেন্ট টেন্ডার আইএফই নং .৫৪.০১.১৫৪৩.৪৫৫.০৭.০৩৭.২৪ এর খোলার তারিখ গতবছরের ৩০ নভেম্বর থাকলেও অদ্যাবদি নিষ্পত্তি করা হয়নি।
রেলে দীর্ঘদিন ধরে তালিকাভুক্ত বৈদেশিক সরবরাহকারী এবং তাদের স্থানীয় প্রতিনিধীর মাধ্যমে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের ভিত্তিতে ইঞ্জিনের বিভিন্ন স্টক ও নন-স্টক মালামাল সমূহ সংগ্রহ করে থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ২০২০ সালে সংগৃহীত ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের লোকোমোটিভের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ওয়ারেন্টি পিরিয়ড উত্তীর্ণ হওয়ার পরও মালামাল ক্রয় পদ্ধতির বহুকাল ধরে চলে আসা নিয়মের পরিবর্তে শুধমাত্র লোকোমোটিভ প্রস্তুতকারক একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি সার্ভিস কন্ট্রাক্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রচলিত নিয়মে তালিকাভুক্ত নিবন্ধিত সরবরাহকারী ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করায় রেলওয়ের ব্যায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা সরকারি ক্রয় আইন এবং ক্রয় বিধিমালার পরিপন্থী।
জানা যায়, মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল সেকশনের প্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয়ে আন্তর্জাতিকভাবে তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী এবং তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিরা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে অংশ নেয়। নন-স্টক স্পেয়ার পার্টসের ক্ষেত্রে সকল প্রস্তুতকারক ও তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে দরপত্র আহবান করে সর্বনিম্ন দরদাতা ও মানসম্পন্ন উৎস নির্বাচন করা হয়। এ পদ্ধতি অনুসরন করার ফলে যথাসময়ে লোকোমোটিভের আউটটার্ন দেয়া যেতো। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে শুধুমাত্র লোকো বিল্ডার্সকে ৩০০০ ও ৬৬০০ সিরিজের যন্ত্রাংশ সরবরাহে একচেটিয়া সুবিধা দেওয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা যথাাসময়ে নীতিমালা বাস্তবায়ন না করে এসব লোকোমোটিভের প্রায় ৭০ শতাংশ অচল করে ফেলা হয়েছে। ফলে প্রতিনিয়তই যাত্রীবাহী গাড়ী চলাচল ঝুঁকিতে পড়ছে।
অন্যদিকে তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের মধ্যে অবারিত প্রতিযোগিতা থাকলে সঠিক সময়ে সঠিক মান নিশ্চিত করে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পাওয়া যায়, যা বাংলাদেশ রেলওয়ের বাজেটের ওপর চাপ পরবে।
উল্লেখ্য যে, নির্দিষ্ট কিছু যন্ত্রাংশ ব্যাতিত অধিকাংশই আইটেম তাদের মনোনীত উৎস থেকে সংগ্রহ করে থাকে। তবে ওয়ারেন্টি পিরিয়ড শেষ হওয়ার প্রায় ৩ বছর পর কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা বিকল্প পর্যালোচনা বা বিকল্প পর্যালোচনা বা তালিকাভুক্ত সরবরাহকারীদের সুযোগ না দিয়ে হঠাৎ সার্ভিস কন্ট্রাক্টের সিন্ধান্ত গ্রহণ করাই। প্রতিযোগিতা না থাকায় নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে।
জরুরী মালামালের ক্ষেত্রে বৈদেশিক সরবরাহকারীদের এজেন্সির মাধ্যমে ক্রয় করলে ৩ মাসের মধ্যে যন্ত্রাংশ সরবরাহ পাওয়া যায়। যা রেলকে সচল রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগেও এই প্রক্রিয়ায় ২৬০০, ২৭০০, ২৯০০, ৬২০০, ৬৩০০, ৬৪০০, ৬৫০০ সিরিজের মালামাল ক্রয় করে ইঞ্জিন সচল রেখেছে।
সার্ভিস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে বিল্ডার্স প্রতিষ্ঠানকে মেইনটেনেন্স এর দায়িত্ব দিলে যন্ত্র প্রকৌশলী বিভাগের সাথে একটা সাংঘর্ষিক অবস্থার তৈরি হবে এবং রেলওয়ের দক্ষ জনবল এ সিরিজের লোকোমোটিভ মেরামতের জ্ঞান লাভ থেকে বঞ্চিত হতে পারে যা রেলওয়ের জন্য ভবিষ্যৎ ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
একক উৎস হতে দরপত্রের মাধ্যমে কেবল নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে লং-টার্ম সার্ভিস কন্ট্রক্ট করা প্রকিউরমেন্ট আইন লঙ্গনের সামিল। শুধু তাই নয়, প্রতিযোগিতাহীন সার্ভিস কন্ট্রাক্টের ফলে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ ও যন্ত্রাংশের উচ্চমূল্য নির্ধারণ করতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা ও সরবরাহকারী জানান, রেলভবন ও মন্ত্রণালয় থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটা নিয়ে চট্টগ্রামের কারো কোন কথা বলার সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে,বাংলাদেশ রেলওয়ে স্পেয়ার্স এন্ড এক্সোসরিজ সাপ্লাইয়ার্স এসোসিয়েশন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারী বলেন, রেলের তালিকাভুক্ত বৈদেশিক সরবরাহকারীদের মাধ্যমে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের ভিত্তিতে লোকোমোটিভের বিভিন্ন স্টক ও নন-স্টক মালামাল সংগ্রহ করে থাকে। কিন্তু নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি হইলে প্রতিযোগিতার সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন?
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের সরাসরি সার্ভিস কন্ট্রাক্টের ফলে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। এতে যন্ত্রাংশ সংগ্রহে ব্যয় বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। একাধিক যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হলে সেবা ও যন্ত্রাংশের মূল্য তুলনামূলকভাবে কমের পাশাপাশি মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।
কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করা হলে বাজারদর যাচাই ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করার সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে।লোকোমোটিভের ওয়ারেন্টি মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় তিন বছর পর প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ না করে শুধু লোকোমোটিভ প্রস্তুতকারী একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সার্ভিস কন্ট্রাক্ট করা সরাসরি সার্ভিস কন্ট্রাক্ট চুক্তি রাষ্ট্রবিরোধীর সামিল।এতে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেন মোবাইল ফোনে জানান, ইন্দোনেশিয়াতেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। গত বছর একটি দল সেখানে সার্ভিস কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে গিয়েছিল। আপনি তাদের কাছে জানতে পারেন।
প্রতিনিধি/আরএইচ