ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের লক্ষ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার মাধ্যমে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, প্রায় ছয় মাস পর তা এখন গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’র সার্বভৌমত্ব ও নিয়ন্ত্রণ দখলের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই স্ট্র্যাটেজিক জলপথটির ওপর থেকে ইরান ধীরে ধীরে তার দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্র ও জাহাজ চলাচলের স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং ড্যাশবোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনীর ক্রমাগত উপস্থিতি ও টহলের মুখে ইরান জলপথটিতে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
শিপিং ট্র্যাকিং সংস্থা ‘কেপলার’ তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারাপার হওয়া ৮০ শতাংশের বেশি জাহাজ জাতিসংঘ অনুমোদিত ওমানের উপকূলীয় নৌপথ ব্যবহার করেছে। ইরান এই বিকল্প পথের তীব্র বিরোধিতা করে কয়েকটি জাহাজে হামলা চালালেও, অধিকাংশ আন্তর্জাতিক নৌযান এখন তেহরানের হুমকি উপেক্ষা করে মার্কিন নৌবাহিনীর সুরক্ষার ওপর ভরসা রাখছে।
কেপলারের অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান হোমায়ুন ফালাকশাহী পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে জানান, এক মাস আগের চিত্রে ওমানের পথ ধরে কোনো জাহাজই চলেনি। কিন্তু বর্তমানে ইরানের পছন্দের মূল পথ এড়িয়ে চলায় দেশটি হরমুজ পারাপারকারী নৌযানগুলোর কাছ থেকে পূর্বের মতো টোল আদায় করতে পারছে না।
জ্বালানি খাতের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘পিকারিং এনার্জি পার্টনার্স’ এর প্রতিষ্ঠাতা ড্যান পিকারিং জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ জাহাজ মালিকই ইরানের বেআইনি টোল আদায়ের দাবি আর মানছেন না। ফলে ওমানের নিরাপদ জলপথ ব্যবহার করাই এখন তাঁদের কাছে একমাত্র যুক্তিসংগত বিকল্প হয়ে উঠেছে।
এদিকে জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটস’ এর প্রেসিডেন্ট অ্যান্ডি লিপো জানান, সামুদ্রিক ঝুঁকি এড়াতে কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেলবাহী জাহাজ (ভিএলসিসি) ভাড়া করে পারস্য উপসাগরের বাইরে অপেক্ষমাণ অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করছে। আক্রমণের ঝুঁকি কমাতে এসব জাহাজ টানা কয়েক সপ্তাহ নিজেদের ট্রান্সপন্ডার বা ট্র্যাকিং ডিভাইস বন্ধ রাখছে, যা তথাকথিত ‘ডার্ক ট্রাফিক’ হিসেবে কেপলারের মতো পর্যবেক্ষণ সেবার অগোচরে থেকে যাচ্ছে।
তবে এই অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতির কারণে তারা অধিকাংশ তেলবাহী জাহাজের ওপর নজর রাখতে সক্ষম হচ্ছে। মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইটের দাবি অনুযায়ী, সম্প্রতি এক সপ্তাহে প্রণালিটি দিয়ে যাওয়া ও বিকল্প পথে পাঠানো তেলের সম্মিলিত পরিমাণ ছিল প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল- যা যুদ্ধপূর্ব স্বাভাবিক পরিবহনের (প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল) খুব কাছাকাছি।
এর ওপর ভিত্তি করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজের ওপর ওয়াশিংটনের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’-এর দাবি করলেও বিশ্লেষকেরা তা মানতে নারাজ। পিকারিং ও লিপো উভয়ের মতে, অঞ্চলটিতে এখনও ইরানের হামলা অব্যাহত থাকায় কোনো পক্ষই একক বা শতভাগ নিয়ন্ত্রণ দাবি করতে পারে না; তবে তথ্যপ্রমাণ নিশ্চিত করে যে এক-দুই মাস আগের তুলনায় ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা ও ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
দেশবার্তা/একে