বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচার বা ট্রেড-বেজড মানি লন্ডারিং (টিবিএমএল) ঠেকাতে কমন প্রাইস ভেরিফিকেশন প্ল্যাটফর্ম চালু, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় জোরদার, উচ্চঝুঁকির বাণিজ্য লেনদেনে বাড়তি নজরদারি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে রিলেটেড-পার্টি লেনদেন, অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ, অ্যাডভান্স পেমেন্ট, বায়ারের ক্রেডিট, ফ্রোজেন ফুড, স্টক লট পোশাক ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের কার্যক্রমে বিশেষ নজরদারি করা হবে।
সম্প্রতি টিবিএমএল-সংক্রান্ত এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টিলিজিন্স সেল ও কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ অপারেশন ডিপার্টমেন্ট এর সংশ্লিষ্ট নির্বাহী পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, ঢাকা কাস্টম হাউস, আইসিডি কমলাপুর কাস্টমস হাউজ, বেনাপোল কাস্টম হাউস ও মোংলা কাস্টম হাউসের প্রতিনিধি এবং উচ্চ বাণিজ্যিক লেনদেনসম্পন্ন ১৫টি তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। গত ৩০ আগস্ট সভা হয়।
সভার কার্যপত্র ও উপস্থিত একাধিক ককর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টিবিএমএল প্রতিরোধে গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর, ঝুঁকিভিত্তিক ও ডেটাচালিত ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ঘোষিত মূল্য যাচাইয়ে বাণিজ্যিক প্যারামিটার, লেনদেনের মূল্য, পণ্যের মান ও স্পেসিফিকেশন, উৎপত্তি, ফ্রেইট, বিমা এবং ইনভয়েস মূল্য বিবেচনায় নেওয়া হবে।
সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, কাস্টমসের মূল্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একটি অভিন্ন রেফারেন্স ও কমন ডেটাবেজ তৈরি করে পণ্যের দামের তারতম্য দেখা গেলে বাড়তি যাচাই করা হবে। পাশাপাশি শিপিং লাইন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার, শিপিং রুট, ফ্রেইট মূল্য ও বাণিজ্যিক মূল্যের তথ্য টিবিএমএল ঝুঁকি বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হবে।
টিবিএমএল শনাক্তে কাস্টমস ডিক্লারেশন, বিল অব এন্ট্রি, বিল অব লেডিং, এলসি, ইনভয়েস, শিপিং ডকুমেন্ট, ক্রেতা ও সরবরাহকারীর তথ্য এবং কাস্টমার প্রোফাইল যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসাইকুডা সিস্টেমের ইজিএম, আইজিএম ও বিল অব এক্সপোর্ট এর তথ্য ব্যবহার করে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও তথ্য বিশ্লেষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সভায় রিলেটেড-পার্টি ও গ্রুপ অব কোম্পানির লেনদেন, অ্যাডভান্স পেমেন্ট, অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ ও বায়ারের ক্রেডিটকে উচ্চঝুঁকির বাণিজ্য হিসেবে চিহ্নিত করে এসব ক্ষেত্রে বাড়তি যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া ফ্রোজেন ফুড, স্টক লট আরএমজি ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের কার্যক্রমে বিশেষ নজরদারির কথা বলা হয়েছে।
টিবিএমএল প্রতিরোধে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে পিপিপি মডেলে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠনের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী টিবিএমএল প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, আন্তঃসংস্থা সমন্বয়, তদন্ত এবং সফল আইন প্রয়োগের ফলাফল জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
টিবিএমএল বলতে সাধারণত অতিমূল্যায়ন বা কমমূল্যায়ন একাধিক বা ভুয়া ইনভয়েস, পণ্যের ভুল এইচএস কোড, শিপিং ডকুমেন্টে কারসাজি, ফ্রেইট ও বিমার মূল্য পরিবর্তন, সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে লেনদেন এবং অ্যাডভান্স পেমেন্টের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের মতো কৌশলকে বোঝানো হয়েছে।
সভায় বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, দুর্নীতি দমন কমিশন , পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিরেক্টরেট, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় আলোচনা করা হয় যে, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে পণ্যের প্রকৃত অবস্থান ও পরিবহন পরিস্থিতি যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের কন্টেইনার ট্র্যাকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে থাকে। তবে এসব সফটওয়্যারের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, ব্যবহার ব্যয় এবং সীমিত সাবস্ক্রিপশনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকসমূহ পণ্যের অবস্থান যথাযথভাবে যাচাই করতে সক্ষম হয় না। সভায় আরও উল্লেখ করা হয় যে, আন্তর্জাতিক মেরিটাইম ব্যুরো কর্তৃক প্রদত্ত কন্টেইনার ট্র্যাকিং তথ্য নির্ভরযোগ্য, সঠিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, টিবিএমএল প্রতিরোধ করা শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয় পৃথিবীর সব দেশের জন্যই কষ্টকর।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলেন, বিশেষ করে সিসিআইএন্ডই কর্তৃক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এক্সপোর্ট এন্ড ইম্পোর্ট সার্টিফিকেট প্রদান করা হয় বলে ব্যাংকের পক্ষে আদৌও প্রতিষ্ঠানটি সেই ধরনের ব্যবসা করে কি না তা প্রমাণ করা কঠিন। আবার ইনভেস্ট বাংলাদেশ কী কী সেবা প্রদান করে তা চেক করার কোনো ব্যবস্থা নেই, আবার কাস্টমস কীভাবে কর নির্ধারণ করে সেই পদ্ধতি তাদের জানা নেই। এ কারণে তারা সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চান।
আরেক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ইন্ডেন্টভিত্তিক এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকসমূহের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।এ ধরনের ব্যবসায় আদৌও সঠিক পণ্যমূল্য ব্যাংকের নিকট সরবরাহ করেছে কি না তা যাচাই করার কোনো পদ্ধতি নেই। একইসঙ্গে নতুন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যমূল্যের এবং বিশেষায়িত ক্যাপিটাল মেশিনারিজ/ইকুইপমেন্ট আমদানির ক্ষেত্রে কোনো রেফারেন্স মূল্য ব্যাংকের নিকট থাকে না তাই ব্যাংক কোনো মূল্যে এলসি খুলবে তা নিয়ে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, ইম্পোর্টের ক্ষেত্রে (নিদিষ্ট ভ্যালুর উপরে) ক্রেডিট রিপোর্ট নেয়া বাধ্যতামূলক হলেও এক্সপোর্টের ক্ষেত্রে তা বাধ্যতামূলক নয়। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী এই সুযোগ গ্রহণ করে অর্থ পাচার করে থাকে। তবে ইম্পোর্টের ক্ষেত্রে (নিদিষ্ট ভ্যালুর উপরে) ক্রেডিট রিপোর্ট ভালোভাবে পর্যালোচনা না করেই এলসি স্থাপন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় রেটিং খারাপ, অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের সাথে এলসি স্থাপনের মাধ্যমে অর্থ পাচারের পথ সুগম করে।
দেশবার্তা/এমআর