বিদ্যুৎ চলে গেলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নেমে আসে অস্বস্তি। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠা, কাজের ব্যাঘাত, অন্ধকারে বসে থাকা কিংবা বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষা। লোডশেডিংয়ের সঙ্গে এমন অভিজ্ঞতা কমবেশি সবারই আছে। কিন্তু এই চেনা অভিজ্ঞতাই যখন সিনেমার গল্পের বিষয় হয়ে ওঠে, তখন সেটি শুধু অন্ধকারের গল্প থাকে না। উঠে আসে মানুষের জীবন, সমাজ, রাজনীতি, বৈষম্য ও প্রযুক্তিনির্ভরতার নানা দিক।
বিদ্যুৎকে ঘিরে তৈরি সিনেমার তালিকায় অন্যতম উল্লেখযোগ্য মালয়ালাম ছবি ‘ওরিদাথু’। ১৯৮৭ সালে গোবিন্দন আরাভিন্দনের পরিচালনায় নির্মিত এই ব্যঙ্গাত্মক ছবির গল্প একটি প্রত্যন্ত গ্রামে প্রথমবার বিদ্যুৎ পৌঁছানোকে ঘিরে। বিদ্যুৎ আসার আগে গ্রামের জীবন যেমন ছিল, নতুন প্রযুক্তি আসার পর সেই জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে তা হাস্যরস ও ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের সরকারি চলচ্চিত্র আর্কাইভের তথ্যেও ছবিটিকে বিদ্যুৎ আসার ফলে একটি গ্রামের জীবনে তৈরি হওয়া পরিবর্তনের গল্প হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ-সংকট ও লোডশেডিংকে আরও সরাসরি তুলে ধরেছে ২০১২ সালের পাঞ্জাবি সিনেমা ‘পাওয়ার কাট’। জাসপাল ভাট্টির পরিচালনায় নির্মিত এই হাস্যরসাত্মক ছবিতে বিদ্যুৎ-সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও দুর্নীতিকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। গল্পের পটভূমিতে রয়েছে ভারতের পাঞ্জাবের ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়া।
বিদ্যুৎ-সংকটের আরও বাস্তব ও কঠিন চিত্র দেখা যায় তথ্যচিত্র ‘কাটিয়াবাজ’-এ। কানপুরের দীর্ঘ লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবিতে দেখানো হয়েছে, বিদ্যুতের ঘাটতি কীভাবে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার একটি পেশার জন্ম দেয়। ছবির অন্যতম চরিত্র লোহা সিং বিদ্যুৎ চুরি করে মানুষের বাড়িতে সংযোগ দেন। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ঋতু মহেশ্বরী অবৈধ সংযোগ বন্ধ করার চেষ্টা করেন। ছবিটি কানপুরের বিদ্যুৎ-সংকটকে কেন্দ্র করে নির্মিত এবং দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে, সেটিও তুলে ধরে।
২০১৭ সালের তামিল সিনেমা ‘কানাভু ভারিয়াম’-এর গল্পও বিদ্যুৎ-সংকট ঘিরে। অরুণ চিদাম্বরম পরিচালিত ছবিটি তামিলনাড়ুর গ্রামাঞ্চলের বিদ্যুৎ-ঘাটতি ও বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সমস্যাকে কেন্দ্র করে নির্মিত। ফলে বিদ্যুৎ এখানে শুধু পটভূমি নয়, গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছবিটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয়েছে এবং পুরস্কারও পেয়েছে।
বিদ্যুতের সংকট যখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় রূপ নেয়, সেই দিকটিও উঠে এসেছে ‘বাত্তি গুল মিটার চালু’ ছবিতে। ২০১৮ সালের এই হিন্দি ছবিতে বিদ্যুৎ-সংকটের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল ও বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার নানা অনিয়মকে গল্পের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
আর লোডশেডিং যদি হঠাৎ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন একটি সমাজ কতটা ভেঙে পড়তে পারে সেই প্রশ্নের অন্ধকার দিক দেখিয়েছে ১৯৯৬ সালের হলিউডের ‘দ্য ট্রিগার ইফেক্ট’। ছবিতে হঠাৎ বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর যোগাযোগব্যবস্থা, নগদ টাকা তোলার ব্যবস্থা ও দৈনন্দিন জীবন অচল হয়ে যায়। ক্রমে মানুষের মধ্যে ভয়, অবিশ্বাস ও বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে। ছবিটির মূল ভাবনাই হলো- প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতার নিরাপত্তার আবরণ সরে গেলে মানুষের আচরণ কত দ্রুত বদলে যেতে পারে।
লোডশেডিংয়ে পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে সেটি দেখানো হয়েছে কলকাতার ‘নিশিযাপন’ সিনেমায়। ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি পরিচালনা করেন সন্দীপ রায়। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটির গল্প উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকার একটি নির্জন বাংলোয় বেড়াতে যাওয়া এক পরিবারকে ঘিরে। হঠাৎ ভূমিকম্পে ভেঙে যায় যোগাযোগের পথ। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় চারপাশ ডুবে যায় অন্ধকারে। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে খাদ্যসংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে পড়ে পরিবারটি। আর এই পরিস্থিতিতেই ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে মানুষের ভেতরের ভয়, লোভ, হিংসা ও স্বার্থপরতা।
ছবিটিতে অভিনয় করেছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সব্যসাচী চক্রবর্তী, দীপঙ্কর দে ও রাইমা সেনসহ অনেকে। তবে ‘নিশিযাপন’ শুধুই দুর্যোগে আটকে পড়া কয়েকজন মানুষের গল্প নয়, বিদ্যুৎহীন একটি রাত, বিচ্ছিন্ন একটি পাহাড়ি বাংলো আর চারপাশের অনিশ্চয়তাকে কেন্দ্র করে সিনেমাটি যেন একটি প্রশ্নই ছুড়ে দেয়- বাইরের আলো নিভে গেলে মানুষের ভেতরের অন্ধকার কতটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে?
দেশবার্তা/এমআর