জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা এখন কৃষকের ঘাড়ে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করায় শুধু সেচ নয়, জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও কৃষিপণ্য পরিবহনের খরচও বাড়বে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, শুধু ডিজেলের বাড়তি দামের কারণে বছরে কৃষকের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার ৮৮ কোটি টাকা। এছাড়াও মাঠে থাকা আমন ধান ঘরে তোলার সময়ই যার প্রাথমিক চাপ পড়বে কৃষকের উৎপাদন খরচে।
শুধু তাই নয়, কয়েক মাস পর শুরু হওয়া বোরোর মৌসুম নিয়েও বেড়েছে অনিশ্চয়তা। যেহেতু বোরো ধানের উৎপাদন সেচনির্ভর তাই ডিজেলের বাড়তি দাম কৃষকের দুশ্চিন্তা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দিন শেষে এইভার পুরোটাই বহন করতে হবে ভোক্তাকে।
কৃষকের বাড়তি ব্যয় ২ হাজার ৮৮ কোটি টাকা
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। নতুন দাম কার্যকর হয়েছে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে। এর আগে চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩৫ টাকা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ বা ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে। কৃষিতে ডিজেলের ব্যবহার শুধু সেচে সীমাবদ্ধ নয়। জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, ফসল কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই এবং কৃষিপণ্য পরিবহনেও এর ব্যবহার রয়েছে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কৃষি উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই পড়বে।
মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আগের দামে কৃষকের বছরে ডিজেল বাবদ ব্যয় হতো প্রায় ১২ হাজার ৬ কোটি টাকা। প্রতি লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ায় এই ব্যয় বেড়ে প্রায় ১৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। অর্থাৎ শুধু ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ২ হাজার ৮৮ কোটি টাকা। তবে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু সরাসরি জ্বালানি ব্যয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সেচের পানি, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টার, মাড়াইযন্ত্র ও পরিবহন সেবার মূল্য বাড়লে কৃষকের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
আমন ঘরে তুলতেই বাড়বে খরচ
এখন মাঠে রয়েছে আমন ধান। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এমন সময়ে ডিজেলের দাম বাড়ায় ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনে বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়ছেন কৃষক।
নওগাঁর হোগলবাড়ী গ্রামের কৃষক মাহবুব তালুকদার বলেন, এবার আমন চাষে সব মিলিয়ে তাঁর খরচ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সার ও সেচের ব্যয় বৃদ্ধির পর এখন ডিজেলের দাম বাড়ায় ধান মাড়াইয়ের খরচও বাড়বে। তিনি বলেন, ‘আমনেই যদি এত খরচ হয়, তাহলে বোরোতে কী হবে, সেটা ভাবতেই ভয় লাগে। বোরোতে সেচ লাগে অনেক বেশি। তাই এবার সেচ কম লাগে—এমন ফসল করার চিন্তা করছি।’
নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার কৃষক অজি উল্যাহ বলেন, আমনের তুলনায় বোরো ধানে সেচ অনেক বেশি লাগে। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ ও মাড়াই—দুই ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়বে। এতে অনেক কৃষক বোরো চাষ থেকে সরে যেতে পারেন।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার কৃষক সিদ্দিক মিয়া বলেন, ‘এভাবে খরচ বাড়তে থাকলে চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। কৃষকের খরচ বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী ধানের দাম বাড়ছে না। নিজের সম্পদ বিক্রি করে কৃষিকাজ করা সম্ভব নয়।’
বোরোতে বড় শঙ্কা
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে আগামী বোরো মৌসুমে। বাংলাদেশে চালের অন্যতম প্রধান উৎস বোরো। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো থেকে। আর বোরো চাষ অনেকাংশেই সেচনির্ভর।
কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প রয়েছে। এসব সেচযন্ত্রের বড় অংশ ডিজেলচালিত। এ ছাড়া রয়েছে প্রায় ১৬ লাখ ডিজেলচালিত ছোট সেচযন্ত্র বা শ্যালো মেশিন।
কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। দেশে প্রায় ১০ হাজার কম্বাইন হারভেস্টার, কয়েক লাখ রিপারসহ মাড়াই, ঝাড়াই ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৯ লাখ কৃষিযন্ত্র রয়েছে, যার প্রায় ৭৫ শতাংশ ডিজেলচালিত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুমকে কেন্দ্র করে ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। অর্থাৎ আগামী ডিসেম্বর থেকে বোরোর প্রস্তুতি শুরু হওয়ার সময়ই কৃষককে বাড়তি দামে ডিজেল কিনতে হবে।ফলে বোরোর জমি প্রস্তুত, সেচ, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনের প্রতিটি পর্যায়েই বাড়তি ব্যয় যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই ব্যয় কৃষকের উৎপাদন সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করতে পারে।
উৎপাদন ব্যয় বাড়লে চাপ পড়বে বাজারে
কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত কৃষিপণ্যের বিক্রয়মূল্যে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ধানের ক্ষেত্রে সেচ ও কৃষিযন্ত্রের ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে পরিবহন ব্যয় যোগ হলে ধানের উৎপাদন খরচ বাড়বে। একইভাবে সবজি, আলু, ভুট্টা, ডালসহ অন্যান্য ফসলেও জমি প্রস্তুত ও পরিবহনের বাড়তি ব্যয় যুক্ত হবে।
তবে ডিজেলের দাম ১৭ শতাংশের বেশি বাড়লেই কৃষিপণ্যের দাম একই হারে বাড়বে—এমন সরল হিসাবের সুযোগ নেই। কারণ কৃষিপণ্যের দামে সার, বীজ, শ্রম, জমির ভাড়া, কীটনাশক, সেচ, যন্ত্রপাতি, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ব্যয় যুক্ত থাকে।
তবে উৎপাদন খরচ বাড়ার সঙ্গে যদি কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হয়, তাহলে কৃষকের আয় কমে যেতে পারে। আর কৃষক যদি বাড়তি ব্যয় পুষিয়ে নিতে পণ্যের দাম বাড়াতে পারেন, সেক্ষেত্রে ভোক্তার খাদ্য ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি থাকবে।
উৎপাদন কমলে বাড়বে আমদানির চাপ
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, বাংলাদেশের কৃষি ডিজেলচালিত সেচের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দাম বাড়লেও কৃষির জন্য ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের বাড়তি খরচ সমন্বয়ে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়াও জরুরি।
তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে অনেক কৃষক বাড়তি ব্যয়ে ফসল উৎপাদন করতে পারবেন না। ডিজেলের এই মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। খাদ্য উৎপাদন কমে গেলে আমদানিও বাড়তে পারে।
তাঁর মতে, যে ভর্তুকি কমাতে জ্বালানির দাম বাড়ানো হলো, উৎপাদন কমে গেলে সেই অর্থের চেয়ে বেশি ব্যয় করে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করতে হতে পারে। খাদ্য উৎপাদন ঠিক রাখা এবং কৃষককে টিকিয়ে রাখতে এখন নগদ সহায়তা বা লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন।
জাহাঙ্গীর আলম খান আরও বলেন, এবার আমন মৌসুমে বৃষ্টির ঘাটতির কারণে অনেক কৃষককে সেচের জন্য বাড়তি খরচ করতে হয়েছে। বোরো মৌসুমের প্রায় ৭৫ শতাংশ জমিতে ডিজেলচালিত সেচপাম্প ব্যবহারের কারণে সেখানে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বড় হবে। উৎপাদন কমে গেলে চাল আমদানির পরিমাণও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের তাগিদ
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, তেলের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব সবকিছুর ওপর পড়ে। এতে কৃষকের খরচ বড় আকারে বাড়ল। এখন মাঠে থাকা আমন ধান ঘরে তোলা, মাড়াই ও পরিবহনের খরচও বাড়বে।
তিনি বলেন, কৃষকের বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। তা না হলে পরবর্তী উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হবে। কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে আগামী মৌসুমে উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, কৃষির উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজন হলে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প থেকে অর্থ সাশ্রয় করে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ানো যেতে পারে।
সরকার বলছে, প্রভাব দেখে ব্যবস্থা
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সরকার কৃষকের পাশে আছে। সরকার বিনা মূল্যে বীজ ও কীটনাশকসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ দিচ্ছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষিতে কিছুটা প্রভাব পড়বে। তবে কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তা পর্যবেক্ষণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জ্বালানির বাড়তি ব্যয় সামলে কৃষকের উৎপাদন ধরে রাখা। কারণ কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ফসলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে তার চাপ পড়বে ভোক্তার ওপর। আবার কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
ফলে আসন্ন বোরো মৌসুমে সেচের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃষকের বাড়তি ব্যয় পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রণোদনা দেওয়া এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা শুধু কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ে নয়, দেশের খাদ্য উৎপাদন, আমদানি ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার বাজারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
দেশবার্তা/এমআর