জন্ম থেকেই দুটি হাত বাঁকা। স্বাভাবিকভাবে লিখতে পারে না, চলাফেরাও কষ্টসাধ্য। তবুও শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও মেধার স্বাক্ষর রেখেছে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের শিশু শিক্ষার্থী লামিয়া আক্তার মাইশা। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করায় বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা ও সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) মোরেলগঞ্জের ১২৩ নম্বর মোরেলগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অডিটরিয়ামে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৫-এ বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মাইশাসহ কৃতী শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
মাইশা ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সে ১০৭ নম্বর বারইখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ কোটায় বৃত্তি অর্জন করেছে সে। তার এই সাফল্যে শিক্ষক, সহপাঠী ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে।
বৃত্তি পরীক্ষার সময় দুই হাতের কনুইয়ের সাহায্যে কলম ধরে খাতায় লিখতে দেখা যায় মাইশাকে। লেখার সময় তার পুরো শরীর কাঁপছিল। অন্য পরীক্ষার্থীদের মতো স্বাভাবিকভাবে লিখতে না পারলেও নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে পরীক্ষা শেষ করে সে। শেষ পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টার স্বীকৃতি পেয়েছে বৃত্তি অর্জনের মধ্য দিয়ে।
মাইশার বাবা রিয়াজ খলিফা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। মা মহিমা বেগম। দুই বোনের মধ্যে মাইশা ছোট।
মাইশার মা মহিমা বেগম বলেন, ‘মাইশা জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। তবে পড়াশোনায় অনেক ভালো। স্কুলের শিক্ষকরা তাকে খুব আদর করেন এবং সহযোগিতা করেন। মা হিসেবে ওর জন্য অনেক কষ্ট করি। আমার সবচেয়ে বড় চিন্তা, আমি মারা যাওয়ার পর মেয়েটা কীভাবে চলবে। সে যেন কারও বোঝা না হয়ে নিজের উপার্জনে বাঁচতে পারে, সেই স্বপ্নই দেখি।’
পরীক্ষা শেষে মাইশা জানায়, অন্যদের মতো স্বাভাবিকভাবে লিখতে না পারায় তার কষ্ট হয়। তারপরও সে নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। বড় হয়ে সরকারি চাকরি করতে চায় সে। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের পাশে থাকতে চায়, কারও বোঝা হয়ে নয়।
মাইশার সাবেক প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা হাসি বলেন, ‘মাইশার অনেক প্রতিভা। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এই শিশুটি স্বাভাবিকভাবে বড় হতে চায়। তার চোখে অনেক স্বপ্ন। মাইশা সমাজের বোঝা নয়, বরং সম্পদ। তার মনের আশা পূরণ হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রেহানা রিয়া বলেন, ‘মাইশা আমার বিদ্যালয়ের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। আমি ও বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকরা তাকে সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা করি। সে একা হাঁটতে পারে না, কথা বলার সময় মুখ বেঁকে যায়। কিন্তু তার ইচ্ছাশক্তি অনেক প্রবল। সহপাঠীরাও তাকে সহযোগিতা করে। তার এই সাফল্যে আমরা আনন্দিত ও গর্বিত।’
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউপিইটিসি ইন্সট্রাক্টর রণজিৎ কুমার মিস্ত্রী। সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয়ের এসএমসি সভাপতি শংকর মজুমদার।
অনুষ্ঠানে প্রধান শিক্ষিকা রেহানা রিয়া বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, এ অর্জন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিদ্যালয়ের সবার জন্য গর্বের। নিয়মিত পড়াশোনা, সময়ের সঠিক ব্যবহার, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য অর্জনের জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন।
বাঁকা দুই হাতের সীমাবদ্ধতা জয় করে মাইশার বৃত্তি অর্জন তার ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন পূরণের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
প্রতিনিধি/আরএইচ