দেশের সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি যেকোন বড় ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি প্রশংসনীয় ভুমিকা পালন করে আসছে। পাশাপাশি বর্তমান সময়ে আলোচিত পুশ ইন ঠেকাতে দেশের মানুষের কাছে আস্থা অর্জন করেছে বাহিনীটি। তবে দেশের ভেতের থাকা একটি কুচক্রি মহল অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মত বিজিবিকে কলুষিত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। এতে বাহিনী তথা দেশের ভাবমুর্তিতে আঘাত হানছে। ওই মহলটি কিছু কথিত গণমাধ্যম ব্যবহার করে বাহিনীর সুনাম ক্ষুন্নের চেষ্টাসহ বাহিনীর কর্মকর্তাদেরও হেয় করার চেষ্টা চালাচ্ছে। যা অনভিপ্রেত ও গণমাধ্যমের নীতি পরিপন্থী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম মুখ থুবড়ে পড়ার অবস্থায় বিজিবি শুধু সীমান্তে নয় সমতলেও তাদের অনন্য ভুমিকা দেশের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে।
জানা গেছে, স্যোশাল মিডিয়া এবং অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে বাহিনী, বাহিনী প্রধান ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে যাচ্ছেতাই কল্পনাপ্রসূত গল্প বলা হচ্ছে। সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী সম্পর্কে বানোয়াট তথ্য এমনকি অপমানজনক, বিরক্তিকর ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা চরম উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌছেছে। বিশেষ করে বিজিবিকে টার্গেট করে এসব রটনা ছড়ানো হচ্ছে।
বিজিবি সূত্র বলছে, চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঠেকাতে পুলিশ-র্যাবের পাশাপাশি সেনাবাহিনীও দায়ত্ব পালন করেছে। দায়িত্ব পালনে পিছপা হয়নি বিজিবি। তবে অন্যান্য বাহিনীর গুলিতে সাধারন মানুষ নিহতের ঘটনা থাকলেও বিজিবির গুলিতে নিহতের কোন ঘটনা ঘটেনি। তবে ওই কুচক্রি মহলের মতে, বিজিবি নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে যার কোন ভিত্তি নেই।
সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল কার্যক্রম ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার প্রসঙ্গে বিজিবি বলছে, স্থানীয় জনগণ, গ্রাম পুলিশ এবং আনসার-ভিডিপি সদস্যদের নিয়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম ও সভা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক করতে ও সচেতনতা বাড়াতে মাইকিং করা হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও ড্রোনের ব্যবহার বাড়াতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বিএসএফের বিভিন্ন পুশইন চেষ্টা তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ করে অনেক জায়গায় তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। গত গত ৪ অক্টোবর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তে অভিযান চালিয়ে মালিকবিহীন ৪ লাখ ২০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করেছে।
গত রোববার (৩ আক্টোবর) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কক্সবাজার ব্যাটালিয়ন (৩৪ বিজিবি)-এর তুমব্রু বিওপির বিশেষ টহলদল এ অভিযান পরিচালনা করে। উদ্ধারকৃত ইয়াবা ট্যাবলেটের বিষয়ে পরবর্তী আইনানুগ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অন্যদিকে সিলেট সেক্টরে ড্রোন ও অন্যান্য নজরদারি প্রযুক্তি পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে একটি বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে মাঝারি ও স্বল্পপাল্লার থার্মাল ড্রোন এবং ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুড়িগ্রাম ও চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে বিএসএফের অবৈধ পুশ-ইন এবং চোরাকারবারিদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের সহায়তায় বারবার ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গত ২ সেপ্টেম্বর দুর্গম পার্বত্য সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনের সময় তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী রহমতপুর এলাকায় নবনির্মিত ‘রহমতপুর বিওপি’ উদ্বোধন করেন।
রামগড় ব্যাটালিয়নের (৪৩ বিজিবি) অধীন এই বিওপি উদ্বোধনকালে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, ফেনী নদীর অববাহিকা ও পার্বত্য ভূপ্রকৃতির কারণে রহমতপুর সীমান্ত এলাকা ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, এ এলাকায় বিজিবির স্থায়ী উপস্থিতি ও নজরদারি জোরদার হলে সীমান্ত নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে। নতুন বিওপি প্রতিষ্ঠার ফলে ফেনী নদীপথ ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় টহল ও নজরদারি বাড়বে। পাশাপাশি চোরাচালানের সম্ভাব্য রুট নিয়ন্ত্রণ এবং মাদক, অস্ত্রসহ অবৈধ পণ্য পাচার প্রতিরোধে বিজিবির আভিযানিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিওপি উদ্বোধন শেষে বিজিবি মহাপরিচালক পানছড়ি ব্যাটালিয়ন (৩ বিজিবি) পরিদর্শন করেন। পরে চট্টগ্রাম বিজিবি রিজিয়নের আওতাধীন বিভিন্ন সেক্টর, ব্যাটালিয়ন, বিওপি ও ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনরত বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে ভিডিও টেলিকনফারেন্সের (ভিটিসি) মাধ্যমে মতবিনিময় করেন।
এর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চকপাড়া সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) আলো নিভিয়ে কয়েকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর (পুশ-ইন) চেষ্টা করে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তৎপরতায় সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকায় রাতভর উত্তেজনা বিরাজ করে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, রাতে সীমান্তের ওপারে হঠাৎই নিরাপত্তা বাতি নিভিয়ে দেয় বিএসএফ। এ ঘটনায় সন্দেহের সৃষ্টি হলে মাইকিং করে এলাকাবাসীকে সতর্ক করা হয়। পরে পাঁচ শতাধিক মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে সীমান্ত এলাকায় জড়ো হন। একই সময়ে বিজিবিও ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়।
শাহবাজপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোজাম্মেল হক ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের উপস্থিতি ও চিৎকার-চেঁচামেচির মুখে বিএসএফ আবার আলো জ্বালায়। এ সময় সীমান্তের ওপারে বিএসএফের চারটি গাড়ি এবং সাদাপোশাকের কয়েকজনকে দেখা যায়। বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দারা রাতভর সীমান্তে পাহারা দেন। পরে পুশ-ইনের জন্য জড়ো করা লোকজনকে সরিয়ে নেয় বিএসএফ।
৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়ন জানায়, ব্যাটালিয়নের সদস্য ও স্থানীয় গ্রামবাসীর যৌথ তৎপরতায় সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশের একটি চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ভারতের ১১৯ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের মল্লিক সুলতানপুর ক্যাম্পের অধীন সীমান্ত পিলার ১৮৩/৩-এস-এর কাছে আকস্মিকভাবে বর্ডার সিকিউরিটি লাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সময়ে শূন্যরেখা থেকে প্রায় ৬০০ গজ ভেতরে ভারতের ‘মুসলিম পাড়া’ এলাকায় আনুমানিক ১২ জনের সমাগম দেখা যায়। খবর পেয়ে বিজিবির টহল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় সতর্ক অবস্থান নেয়। এ ঘটনায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে সোমবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে বিএসএফ নিজেদের গাড়িতে করে ওই ব্যক্তিদের মালদাহ হোল্ডার সেন্টারে নিয়ে যায় বলে নিজস্ব সূত্রে জানতে পারে বিজিবি।
ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সব ধরনের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করছে বিজিবি। এ ধরনের কার্যক্রমে এলাকাবাসী বিশেষ সহযোগিতা করছে এবং ভবিষ্যতেও এই যৌথ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়ার সুযোগে সাতক্ষীরার কালিন্দী নদী সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জনকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করে। প্রচণ্ড বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা অত্যন্ত সফলভাবে বিএসএফের এ অপচেষ্টা প্রতিহত করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
প্রচণ্ড বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার সুযোগে বিজিবির নীলডুমুর ব্যাটালিয়ন (১৭ বিজিবি)-এর দায়িত্বপূর্ণ খুরমী বিওপি থেকে দক্ষিণ দিকে আনুমানিক ৩.৫ কিলোমিটার দূরে কালিন্দী নদীর মধ্যস্থ চর এলাকায় (ছোট) বাঁশঝাড়িয়া মিনি ফরেস্ট নামক স্থানে ভারতের ৭৭ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের চর সাহেবখালী বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা ১টি কান্ট্রি বোট ও ১টি স্পিডবোটযোগে অজ্ঞাতনামা ১০-১২ জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে।
বিষয়টি খুরমী বিওপির টহলদলের নজরে আসলে প্রচণ্ড বৃষ্টি উপেক্ষা করে বিজিবি সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে স্পিডবোটযোগে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উক্ত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা প্রদান করে। বিজিবির দৃঢ় অবস্থানের কারণে বিএসএফ সদস্যরা উক্ত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে প্রবেশ করাতে ব্যর্থ হয়। সকাল ১১টার দিকে বিএসএফ সদস্যরা উক্ত ১০-১২ জন ব্যক্তিকে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বিজিবির তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় অবস্থানের ফলে বিএসএফ কর্তৃক অবৈধ পুশইনের চেষ্টা কার্যকরভাবে প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।
নীলডুমুর ব্যাটালিয়ন (১৭ বিজিবি) এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার আবু সহল আব্দুল্লাহ বলেন, দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ১৭ বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্কতা, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, প্রচলিত আইন এবং বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার পরিপন্থি যেকোনো পুশইনের অপচেষ্টা ১৭ বিজিবি কর্তৃক কঠোরভাবে প্রতিহত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পুশইন প্রতিরোধে সীমান্ত এলাকায় বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও অপারেশনাল কার্যক্রম বহুগুণে জোরদার করা হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৭ বিজিবি সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তীতে জনগনকে সঙ্গী করে সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন, কাঁটাতার স্থাপন, মাদক ও মানবপাচার প্রতিহত করা, মায়ানমার সীমান্তের অস্থিতিশীলতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিজিবির সাহসী ভূমিকা বাহিনীটির প্রধানসহ বিজিবি জনমনে কেবল আস্থা ফেরায়নি, নতুন ভরসাও জাগিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে ভারতীয় রক্ষীবাহিনী বিএসএফের যেকোনো ‘পুশইন’ রুখে দিচ্ছে দৃঢ়তার সাথে। দেশের সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এ কার্যক্রমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করতে পারা একটি মাইলফলক ঘটনা।
দেশবার্তা/আইএইচই/আরএইচ