জলবায়ু-সহনশীল জাতের বীজ ব্যবহারের ফলে বন্যা, লবণাক্ততা ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেই এখন কম জমিতে অধিক ধান উৎপাদন করছে বাংলাদেশ। ফলে আবাদি জমির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে টেকসই খাদ্য উৎপাদনের নতুন পথ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে আউশ, আমন ও বোরো ধানের আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ২ শতাংশ কমেছে। অথচ একই সময়ে ধানের মোট উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ এবং একরপ্রতি ফলন বেড়েছে ১০.৩ শতাংশ।
২০২০-২১ অর্থবছরে ২৮ হাজার ৯১২ একর জমিতে ধানের উৎপাদন ছিল ৩৭ হাজার ৬০৮ টন। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৮ হাজার ৩১৭ একর জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে ৪০ হাজার ৬৩০ মিলিয়ন টন। এই সময়ে একরপ্রতি গড় ফলন ১ হাজার ৩০১ কেজি থেকে বেড়ে ১ হাজার ৪৩৫ কেজিতে উন্নীত হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ু ও ভৌগোলিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে উপযোগী ধানের জাত উদ্ভাবন এবং তা কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কারণেই এই সাফল্য এসেছে।
উদাহরণ হিসেবে সাতক্ষীরার উপকূলীয় দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার কথা বলা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতবিক্ষত এই এলাকার মাটিতে তীব্র লবণাক্ততা থাকা সত্ত্বেও সেখানে এখন নতুন করে ধান চাষ শুরু হয়েছে। ওই ইউনিয়নের সোরা গ্রামের কৃষক আবদুর ওয়াহাব ৩ বিঘা জমিতে ব্রি ধানের চাষ করেছেন। তিনি জানান, লবণাক্ততার কারণে আগে এই এলাকায় ধান চাষ করা যেত না।
ওয়াহাব বলেন, 'এ বছর আমি পরীক্ষামূলকভাবে ধান চাষ করেছি। দেখাদেখি অন্য কৃষকেরাও ধান চাষ করেছেন। আমরা বিআর-৪৯ জাতের বীজ রোপণ করেছি; চারাগুলো এখনো ভালো অবস্থায় আছে। ভালো ফলনের আশা করছি। আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে ফসল ঘরে তুলতে পারব বলে আশা করছি।'
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল জানান, গবেষণার মাধ্যমে ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সেই বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, লবণাক্ততাপ্রবণ উপকূলীয় এলাকায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ব্রি ধান-৪৭, ব্রি ধান-৫৫, ব্রি ধান-৬১, ব্রি ধান-৬৭, বিনাধান-৮ ও বিনাধান-১০ চাষাবাদে উৎসাহ দিচ্ছে। অন্যদিকে বন্যাপ্রবণ এলাকায় কৃষকদের ব্রি ধান-৫১ ও ব্রি ধান-৫২ চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আমন মৌসুমে এই জাতগুলো সাত থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত পানির নিচে ডুবে থাকলেও টিকে থাকতে পারে। এছাড়া স্বল্প জীবনকালের ব্রি ধান-১১৮ জাতটিও বন্যাপ্রবণ এলাকায় চাষের জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
হাওর অঞ্চলের মতো এলাকাগুলোতে আগাম পাহাড়ি ঢলের কারণে ফসল ঝুঁকিতে থাকে। ওবায়দুর রহমান জানান, এসব এলাকায় বন্যার পানি আসার আগেই যাতে কৃষকেরা ধান কেটে ঘরে তুলতে পারেন, সেজন্য সেখানে স্বল্পমেয়াদি জাতের বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে খরাপ্রবণ এলাকাগুলোতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিনাধান-৭, ব্রি ধান-৫৬ ও ব্রি ধান-৫৭ বিতরণ করছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিং বিভাগের অধ্যাপক ফিরোজ মাহমুদ বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়নের ফলে ক্রমাগত আবাদি জমির পরিমাণ কমছে। তাই বাংলাদেশকে এখন অল্প জমি থেকেই আরও বেশি খাদ্য উৎপাদন করতে হবে। 'এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের নির্দিষ্ট ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করতে সক্ষম, এমন উন্নত জাত উদ্ভাবন এবং সেগুলো কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি,' বলেন তিনি।
আবাদি জমি কমে আসায় ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টি মূলত অধিক উৎপাদনশীলতার ওপর নির্ভর করবে। তবে ফলন বাড়াতে গিয়ে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে বলে জানান অধ্যাপক ফিরোজ মাহমুদ।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তথ্যানুসারে, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে আউশ ধানের বীজ উৎপাদন প্রায় ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। ৪ হাজার ৫৭৬.৭৭ টন থেকে বেড়ে এই উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯৯৯.৯১ টনে। একই সময়ে আমন বীজের উৎপাদন ২৩ হাজার ৩৪৩.২১ টন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৭৮৯.২১ টন।
অন্যদিকে বোরো মৌসুমের ইনব্রিড ও হাইব্রিড বীজের উৎপাদন ৬৫ হাজার ৪৪৩.৮৬ টন থেকে কমে ৫২ হাজার ৭২০ টনে নেমে এসেছে। অবশ্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষকদের মাঝে ৫৯ হাজার ৫৪৭.২১ টন বোরো বীজ বিতরণ করা হয়েছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিং বিভাগের আরেক অধ্যাপক নাহিদ জেবা বলেন, উন্নত জাতের বীজের কারণেই খরা, লবণাক্ত ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় এখন ধান চাষ সম্ভব হচ্ছে। এমনকি যেখানে চাষের মৌসুম সংক্ষিপ্ত, সেখানেও আবাদ করা যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, গবেষকেরা জিনগত পরিবর্তন এবং কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যগুলোর সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নির্দিষ্ট প্রতিকূলতা-সহনশীল জাত উদ্ভাবন করছেন। এটি ধানের উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করছে।
তবে নতুন উদ্ভাবিত জাতের ফসল থেকে কৃষকেরা নিজেরা বীজ সংরক্ষণ করে পরেরবার রোপণ করলে সব সময় একই রকম ফলন না-ও পেতে পারেন বলে জানান নাহিদ জেবা। তাই জাতীয় উৎপাদন ধরে রাখতে কৃষি সংস্থাগুলোকে উন্নত বীজের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখতে হবে।
তিনি বলেন, 'শুধু ধান নয়, পোকামাকড়, খরা, লবণাক্ততা ও অন্য প্রতিকূলতা-সহনশীল অন্যান্য ফসল উদ্ভাবন করা গেলে তা খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুষ্টিমান ও খাদ্যের গুণগত মান বজায় রাখতেও সাহায্য করবে।' কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তাদের মূল পরিকল্পনা প্রতিটি অঞ্চলের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত বীজ পৌঁছে দেওয়া; যেন আবাদি জমি কমে গেলেও এবং পরিবেশ আরও প্রতিকূল হলেও ধানের উৎপাদন অব্যাহত থাকে।
দেশবার্তা/জেএ