তিস্তা নদীর গোবর্ধন চরের কৃষকদের কাছে নদী ও বৃষ্টি যেন একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও অম অভিশাপ। বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি ও নদীর উপচে পড়া পানিতে নিচু এলাকার ফসল তলিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে, আর শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টির অভাব ও নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় ধুঁকতে হয় উঁচু জমিকে। এই দুই বিপরীতধর্মী সংকট সামলে পরিবার চালানো এবং চাষাবাদের খরচ তুলতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাজারে ধানের দাম কমে যাওয়ায় তাঁদের আগের অনিশ্চিত জীবিকা এখন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার গোবর্ধন চরের কৃষক মোহাম্মদ বসির উদ্দিন (২৯) জানান, এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং জমিতে নদীর পানি না থাকায় আমন ধানের ফলন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চরাঞ্চলে কোনো গভীর নলকূপ সেচসুবিধা না থাকায় রোদ-খরায় জমি শুকিয়ে গেলে কৃষকদের নিঃস্ব হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না।
কৃষকেরা জানান, এবার ভাদ্র মাসে আমনের চারা রোপণ করা হয়েছে এবং এখন অগ্রহায়ণে ধান কাটার অপেক্ষায় দিন গুনছেন তাঁরা। ফলন ভালো না হলেও অন্তত উৎপাদন খরচটুকু উঠে আসবে- এমনটাই প্রত্যাশা তাঁদের।
খরচ ও আয়ের হিসাব তুলে ধরে বসির উদ্দিন বলেন, উঁচু জমিতে প্রতি বিঘায় ধান চাষে প্রায় ৮ হাজার টাকা খরচ হয়ে ফলন পাওয়া যায় মাত্র ৬ থেকে ৭ মণ। অন্যদিকে নিচু জমিতে প্রতি বিঘায় খরচ হয় প্রায় ৬ হাজার টাকা, আর ফলন পাওয়া যায় ৮ থেকে ৯ মণ। তাছাড়া গত বছর প্রতি মণ ধান প্রায় ৯০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার বাজার দর নেমে এসেছে প্রায় ৮০০ টাকায়। ফলে সার, সেচ ও পরিশ্রমের ব্যয় মিটিয়ে হাতে উদ্বৃত্ত কিছু থাকে না।
কৃষিকাজের আয়ে সংসার না চলায় জীবনসংগ্রামের তাগিদে চরের অনেকেই দিনমজুরের কাজ বেছে নিচ্ছেন। কাজের খোঁজে কেউ জেলা শহরে যাচ্ছেন, কেউবা ঢাকায় গিয়ে রিকশা চালাচ্ছেন অথবা চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
মৌসুমি পরিবহন চালিয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। চরের মো. রেজাউল ইসলাম (২০) জানান, গত আট বছর ধরে তিনি ঘোড়ার গাড়ি চালাচ্ছেন। ধান কাটার চার মাসের মৌসুমে দিনে প্রায় ২ হাজার টাকা আয় হলেও বছরের বাকি সময়ে তাঁর আয় কমে যায়। অনাসৃষ্টি ও শুষ্ক মৌসুমে বালুচরে ঘোড়ার গাড়ি চললেও বর্ষায় চরে একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে নৌকা।
অনিশ্চিত আয় ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার কারণে চরাঞ্চলের বহু পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তাও এখন ঝুঁকির মুখে। চরে আমন ধান ছাড়াও আলু, ভুট্টা, মরিচ, মিষ্টিকুমড়া, গম, রসুন, পেঁয়াজ ও তামাকের চাষ করা হলেও কাঙ্ক্ষিত বাজারদর না পেলে প্রতি বছরই লোকসানের মুখে পড়তে হয় তাঁদের।
দেশবার্তা/একে