সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার অটোরিকশা বা ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নিবন্ধন, ফিটনেস সনদ ও জোনভিত্তিক রুট নির্ধারণ বাধ্যতামূলক করে নতুন বিধিমালা জারি করেছে সরকার।
বিধিমালা অনুযায়ী, একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে। এছাড়া এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চালানো যাবে না।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ শীর্ষক বিধিমালাটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় চলাচলকারী ই-রিকশার ক্ষেত্রে এ বিধিমালা প্রযোজ্য হবে।
নিবন্ধন ও যোগ্যতা
প্রতিটি সিটি করপোরেশন সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে তাদের আওতাধীন এলাকায় ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করবে। সামগ্রিকভাবে অথবা জোনভিত্তিক এ সংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে।
ই-রিকশার নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং কোনো উপযুক্ত আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হওয়া যাবে না। বয়সের ক্ষেত্রে বিধিমালায় ‘অনূর্ধ্ব ১৮ বছর’ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নম্বর প্লেট দেওয়া হবে। যানটির দৃশ্যমান স্থানে নিবন্ধন নম্বর প্রদর্শন করতে হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।
আবেদন যাচাই করে সন্তুষ্ট না হলে কর্তৃপক্ষ নিবন্ধনের আবেদন নামঞ্জুর করতে পারবে। তবে নামঞ্জুরের কারণ সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে আবেদনকারীকে জানাতে হবে। সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদেশ পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবেন। আপিলের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
নতুন বিধিমালায় বলা হয়েছে, একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে। এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালানো যাবে না। নিবন্ধন বা নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া কোনো ই-রিকশা সড়কে চলাচল করতে পারবে না।
ফিটনেস, আয়ুষ্কাল ও নিরাপত্তাবিধি
ই-রিকশার নকশা ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য বুয়েটের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী নিশ্চিত করে ফিটনেস সনদ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর ছাড়া কোনো ই-রিকশার নিবন্ধন বা নবায়ন করা যাবে না।
বর্তমানে সড়কে চলাচলকারী ই-রিকশার কাঠামো বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সংশোধন করে অনুমোদন নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষরসহ ফিটনেস সনদ নিতে হবে। পর্যায়ক্রমে ই-রিকশাগুলোকে বিমার আওতায় আনার বিধানও রাখা হয়েছে।
বিধিমালার শর্ত অনুযায়ী, প্রতিটি ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল হবে নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর। এ সময় শেষ হলে নম্বর প্লেটসহ সংশ্লিষ্ট ই-রিকশার নিবন্ধন বাতিল করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রতিটি ই-রিকশায় স্পিডোমিটার অথবা ওডোমিটার স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যান্ত্রিক বা নিরাপত্তাজনিত ত্রুটিযুক্ত এবং নিবন্ধনবিহীন অবৈধ ই-রিকশা সড়কে চালানো যাবে না।
কোনো ই-রিকশায় ত্রুটি দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে গাড়ির সামনের দৃশ্যমান স্থানে ‘যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চলাচল অযোগ্য’ লেখা সাইনবোর্ড প্রদর্শন করতে হবে। এরপর যানটি মেরামতের ব্যবস্থা নিতে হবে। অবৈধ ই-রিকশার চলাচল বন্ধে মেট্রোপলিটন এলাকার ট্রাফিক বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যৌথভাবে অথবা পৃথকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
চলাচলে বিধিনিষেধ
নতুন বিধিমালায় ই-রিকশা চলাচলের জন্য কয়েক ধরনের সড়ক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস চলাচলের সড়ক, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করিডোর ও ফুটপাতে এসব যান চলতে পারবে না। এ ছাড়াও প্রশাসন যেসব সড়কে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, সেসব সড়কেও ই-রিকশা চলাচল করতে পারবে না।
চালককে সব সময় সড়কের বাম লেন অনুসরণ করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না। নিয়মবহির্ভূতভাবে ওভারটেকিং ও লেন পরিবর্তনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ই-রিকশার চলাচলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে রুট বা চলাচলের সড়ক নির্ধারণ করবে। সিটি করপোরেশন এলাকায় জোনভিত্তিক রুট নির্ধারণ করা হবে। এক জোনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না। ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে জোনভিত্তিক বিভক্তকরণ, প্রতিটি জোনে ই-রিকশার সংখ্যা, চলাচলের রুট এবং যানবাহনগুলোর জন্য নির্দিষ্ট রং চূড়ান্ত করবে।
যাত্রী ধারণক্ষমতা ও গতিসীমা
ই-রিকশার আকারভেদে চালক ছাড়া সর্বোচ্চ দুই অথবা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ই-রিকশায় ৪০ ডেসিবেলের বেশি তীব্রতার হর্ন ব্যবহার করা যাবে না। স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার। অন্যান্য ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে রাখতে হবে।
পার্কিং ও চার্জিংয়ের ব্যবস্থা
ই-রিকশার পার্কিং ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিটি ওয়ার্ডে অথবা উপযুক্ত স্থানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পার্কিং এলাকা নির্ধারণ করতে হবে। রিকশার ব্যাটারি চার্জ করার জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট অথবা সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত নির্দিষ্ট গ্যারেজ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি এসব চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরশক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে, বেসরকারি খাতে অথবা অন্য কোনো উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন, গ্যারেজ ও ব্যাটারি বিনিময় কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।
চার্জিং স্টেশনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগ নিতে হবে এবং অনিয়ন্ত্রিত ও নিয়মবহির্ভূত চার্জিং পরিহার করতে হবে। পর্যায়ক্রমে বৈধভাবে নিবন্ধিত চার্জিং স্টেশনে ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ করার ব্যবস্থা করা হবে।
চার্জিং স্টেশনে নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রিড সংযোগের সঙ্গে সৌর প্যানেলের বিদ্যুৎ যুক্ত করতে হবে। এ ব্যবস্থায় দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে রাতে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করা যাবে। চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নিতে হবে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জ দিলে বিদ্যমান সংশ্লিষ্ট আইনে শাস্তি দেওয়া হবে।
ঋণ ও ব্যাটারি পুনর্ব্যবস্থাপনা
অনুমোদিত মানের ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে ই-রিকশার চালক ও মালিকদের সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা, তফসিলি ব্যাংক এবং ফাইন্যান্স কোম্পানি ঋণ সহায়তা দিতে পারবে ।
ই-রিকশা উৎপাদন, আমদানি, ব্যবহার, ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবস্থাপনার সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং এ আইনের অধীনে প্রণীত বিধিমালা ও জারি করা নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি কিংবা এর অংশবিশেষ উন্মুক্ত স্থান, মাটি, জলাশয় বা সাধারণ বর্জ্যে ফেলা যাবে না। এসব ব্যাটারি পোড়ানোও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যাটারি বিক্রেতাকে প্রতিটি নতুন ব্যাটারি বিক্রির সময় ক্রেতার কাছ থেকে একটি পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ করতে হবে। পরে সেটি অনুমোদিত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠানো নিশ্চিত করতে হবে।
ই-রিকশা উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে কমিটি
ই-রিকশার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের সুপারিশ করতে একটি কমিটি গঠন করা হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগের নগর উন্নয়ন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে এ কমিটি গঠিত হবে।
কমিটির সদস্য থাকবেন সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট জেলার মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার নিচে নন—এমন প্রতিনিধি অথবা পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি হিসেবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার নিচে নন—এমন কর্মকর্তা, বুয়েট অথবা এ বিষয়ে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের যান্ত্রিক ও ইলেকট্রিক বিভাগের প্রতিনিধি, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদমর্যাদার নিচে নন—এমন জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন-১ শাখার উপসচিব। উপসচিব কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
কমিটি বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী অনুমোদিত নকশার বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করবে। এরপর ই-রিকশার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ ও প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের সুপারিশ করবে। সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উৎপাদন লাইসেন্স দেবে। প্রয়োজনে কমিটিতে যেকোনো সংখ্যক সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
দুর্ঘটনায় আহতদের সহায়তা করতে হবে চালককে
ই-রিকশা দুর্ঘটনায় পড়লে চালককে তাৎক্ষণিকভাবে যানবাহন থামিয়ে আহত ব্যক্তিদের সহায়তা করতে হবে। একই সঙ্গে ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। পরে পুলিশ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবে।
দেশবার্তা/একে