ভারতের গুজরাটে গরু জবাইয়ের মামলায় তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন গান্ধীনগর জেলার একটি আদালত। রায়ে গরুর ধর্মীয় গুরুত্ব তুলে ধরতে হিন্দু ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতিও উল্লেখ করেছেন আদালত।
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) দেওয়া রায়ে অতিরিক্ত দায়রা জজ বি আর রাজপুত তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৩ লাখ টাকা জরিমানা করেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন ওয়াসিম কুরেশি, মোহাম্মদ রফিক কুরেশি ও আসফাক বাহেলিম। তাঁদের কাছ থেকে ২৭৭ কেজি গরুর মাংস উদ্ধারের পর এ রায় দেওয়া হয়।
এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন গুজরাটের উপমুখ্যমন্ত্রী হর্ষ সাংভি। তিনি বলেছেন, রাজ্যে গরু জবাইয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইন কখনোই ছাড় দেবে না, এ রায় তার স্পষ্ট বার্তা।
প্রাচীন সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থ মনুস্মৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, গরু কেবল একটি প্রাণী নয়; বরং একে বস্তুগত সমৃদ্ধি ও ‘ধর্মের’ (ন্যায়পরায়ণতা) অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিচারক বলেন, ‘ঋষি মনু গবাদিপশুর সুরক্ষা ও পরিচর্যার প্রধান দায়িত্ব বৈশ্য শ্রেণির ওপর অর্পণ করেছিলেন। এ ছাড়া বৈদিক বিবাহের একটি প্রচলিত রীতি অর্ষ বিবাহের ক্ষেত্রেও গরু ও ষাঁড়ের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।’
বেদ ও অন্যান্য হিন্দু ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে আদালত আরও বলেন, তপস্যার শক্তিতে পৃথিবীতে অমৃতের ফোঁটা পড়লে সেখান থেকে ঐশ্বরিক গাভি কামধেনুর আবির্ভাব ঘটে। তাঁকে পৃথিবীর সব গোপ্রজাতির আদি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আদালত বলেন, ‘গরুকে জগতের মাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার মধ্যে ৩৩ কোটি দেবতার বাস। তার চারটি পা চারটি বেদের প্রতীক।’
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট গান্ধীনগর জেলার জামলা গ্রামের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে ২৭৭ কেজি গরুর মাংস, গরু জবাইয়ে ব্যবহৃত অস্ত্র এবং মাংস পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত একটি গাড়ি জব্দ করা হয়।
প্রসিকিউশন জানায়, বাবা-ছেলের একটি চক্র দুর্বল বা দুধ দেয় না—এমন মহিষ কিনত। এরপর আহমেদাবাদ থেকে চারজনকে তাদের বাড়িতে এনে নিষ্ঠুরভাবে পশু জবাই করে মাংস সংগ্রহ করত। পুরো প্রক্রিয়াটি করা হতো আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে।
তদন্তের বরাত দিয়ে প্রসিকিউশন আরও জানায়, অভিযুক্তদের পরিকল্পনা ছিল গুলাম মইন নামে এক ব্যক্তির কাছে মাংস বিক্রি করা। বিচার শেষে ছয় আসামির মধ্যে তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করেন আদালত। অভিযোগ প্রমাণে প্রসিকিউশন ৫৪ জন সাক্ষী ও ১৮টি নথি আদালতে উপস্থাপন করে।
রায়ের পর গুজরাটের উপমুখ্যমন্ত্রী হর্ষ সাংভি গান্ধীনগর পুলিশ ও প্রসিকিউশন দলকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ‘সঠিক তদন্ত এবং শক্তিশালী প্রমাণ উপস্থাপনের কারণেই এ সাজা নিশ্চিত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গুজরাট প্রাণী সংরক্ষণ আইনের আওতায় দেওয়া এ রায় স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, গুজরাটে যারা গরু জবাই করবে, আইন তাদের কখনোই ছাড় দেবে না। গরুমাতাকে রক্ষা করা গুজরাটের অবিচল অঙ্গীকার। সঠিক তদন্ত এবং শক্তিশালী প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য গান্ধীনগর পুলিশ ও সরকারি আইনজীবীদের অভিনন্দন।’
২০১৭ সালে গুজরাট প্রাণী সংরক্ষণ আইন, ১৯৫৪ সংশোধনের মাধ্যমে গরু জবাইয়ের দায়ে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি বাড়িয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান করে রাজ্য সরকার। এর মধ্য দিয়ে গরু জবাইয়ের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান করা ভারতের প্রথম রাজ্যে পরিণত হয় গুজরাট।
রাজ্য বিধানসভায় অনুমোদিত গুজরাট প্রাণী সংরক্ষণ (সংশোধনী) বিলে গরুর মাংস পরিবহন, সংরক্ষণ কিংবা বিক্রির অপরাধে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এর আগে ২০১১ সালে নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে গরু জবাই, গরুর মাংস পরিবহন ও বিক্রির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল রাজ্য সরকার। সূত্র: দ্য হিন্দু
দেশবার্তা/আরএইচ