জমির শেয়ার বিক্রি করে নির্দিষ্ট আয়তনের ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে পরিচালিত অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। সংগঠনটির অভিযোগ, জমির মালিকানা, প্রকল্পের অনুমোদন, নির্মাণের সক্ষমতা ও অর্থের ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করেই পরিচালিত এ ধরনের মডেলে বিনিয়োগ করে এরই মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার নাগরিক আর্থিক ক্ষতি ও আইনি জটিলতার মুখে পড়েছেন।
রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল।
সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাব সভাপতি বলেন, শেয়ারভিত্তিক আবাসন ব্যবসার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামী দুই থেকে তিন বছরে এ-সংক্রান্ত মামলা ও আইনি জটিলতায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সম্প্রতি প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পে প্রতারণার অভিযোগে ৯ হাজার ৮২৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৪০ হাজার ক্রেতার আনুমানিক ১২ হাজার কোটি টাকা জড়িত, যা আবাসন খাতে ক্রেতাদের সুরক্ষা ও তদারকির অভাবকে স্পষ্ট করে তোলে।
রিহ্যাবের অভিযোগ, এ ধরনের ব্যবসায় জমি বা ভবনের বিপরীতে একাধিক ব্যক্তির কাছে শেয়ার বিক্রি, নকশা ও অনুমোদনের তোয়াক্কা না করা এবং দক্ষ প্রকৌশলী ও স্থপতির তদারকি ছাড়াই নিম্নমানের ভবন নির্মাণের প্রবণতা বাড়ছে। এতে ভবন ও ক্রেতা উভয়ের নিরাপত্তাই ঝুঁকিতে পড়ছে।
এছাড়া জমির মূল্য, শেয়ার বিক্রি ও নির্মাণ ব্যয়ের হিসাব অস্পষ্ট থাকায় ভ্যাট, আয়কর ও নিবন্ধন ফি বাবদ বিপুল পরিমাণ সরকারি রাজস্ব ফাঁকির প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে, বিধিমালা মেনে চলা বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো পড়ছে অসম প্রতিযোগিতার মুখে।
ড. আলী আফজাল বলেন, এ ধরনের মডেলে নির্মাণাধীন ১০০টি ভবন পরিদর্শন করলে প্রায় প্রতিটিতেই কোনো না কোনো ধরনের অনিয়ম বা ব্যত্যয়ের অভিযোগ পাওয়া যাবে। এ কারণে শেয়ারভিত্তিক প্রকল্পের ভবনগুলো সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কারিগরি যাচাইয়ের দাবি জানান তিনি।
আবাসন খাতের শৃঙ্খলায় সরকারের কাছে ছয় দফা দাবি জানিয়েছে রিহ্যাব। দাবিগুলো হলো- অনিয়ন্ত্রিত শেয়ারভিত্তিক আবাসন মডেল বন্ধ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ করা; জমির বৈধতা ও অনুমোদন ছাড়া অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করা; বিদ্যমান শেয়ারভিত্তিক প্রকল্পের স্বাধীন কারিগরি ও আইনগত নিরীক্ষা করা; জাল দলিল, ভুয়া অনুমোদন ও অর্থ আত্মসাতের তদন্ত করে বিচার করা; প্রতিটি প্রকল্পের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা এবং পেশাদার প্রকৌশলী ও স্থপতির মাধ্যমে নির্মাণের গুণগত মান ও নিরাপত্তা তদারকি করা।
রিহ্যাব স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা জমির যৌথ মালিকানা বা বৈধ বিনিয়োগের বিরুদ্ধে নয়। তবে যেখানে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের মালিকানা ও হস্তান্তরের নিশ্চয়তা নেই, আইনগত পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেসব প্রকল্পের নতুন বিক্রয় ও অর্থ সংগ্রহ বন্ধ রাখার আহ্বান জানায় সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়, নির্মাণ খাত দেশের মোট জিডিপিতে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ অবদান রাখে এবং তিন শতাধিক সংযোগ শিল্পের মাধ্যমে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ফলে অনিয়ন্ত্রিত শেয়ারভিত্তিক আবাসন ব্যবসার এই সংকট জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক, ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস, ভাইস প্রেসিডেন্ট-২ আবু খালিদ মো. বরকত উল্লাহ, ভাইস প্রেসিডেন্ট-৩ এ এফ এম ওবায়দুল্লাহ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট (ফিন্যান্স) ড. মো. হারুন অর রশিদ।
দেশবার্তা/একে