গত অক্টোবর মাসে সারাদেশে গণপিটুনির ঘটনায় ৩২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) গত অক্টোবরের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে নিহতের সংখ্যা বেড়েছে ৩৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।
রোববার প্রকাশিত এমএসএফের প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত অক্টোবরে সারা দেশে অন্তত ৬৪টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে গণপিটুনিতে ২৩ জন নিহত হয়েছিলেন। তবে একই সময়ে আহতের সংখ্যা ৭৪ থেকে কমে ৫৪ জনে দাঁড়ালেও সংস্থাটি বলছে, আহতের সংখ্যা কমা সহিংসতার মাত্রা কমে যাওয়ার প্রমাণ নয়; বরং এটি নির্দেশ করে যে বর্তমানে গণপিটুনির ধরন অনেক বেশি আক্রমণাত্মক এবং সরাসরি প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে সংঘটিত ৬৪টি ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছে চুরির সন্দেহে। কেবল চুরির অভিযোগেই পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে। এর মধ্যে গত ২৫ অক্টোবর রংপুরের গঙ্গাচড়ায় অটোরিকশা চুরির অভিযোগে দুই যুবক এবং পরদিন মিঠাপুকুরে গরু চোর সন্দেহে খালিদ হাসান (৩২) নামের আরেক যুবককে হত্যা করা হয়। এছাড়া গত ১৩ অক্টোবর সাতক্ষীরার দেবহাটায় ইসলাম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
সাধারণ বিবাদ ও সামাজিক বিরোধের জেরে ৫ জন এবং চাঁদাবাজি ও জমি সংক্রান্ত বিরোধসহ নানা অভিযোগে ১১ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সাতক্ষীরা ও রংপুর ছাড়াও চুয়াডাঙ্গা, গাজীপুর, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ অন্তত ২৪ জেলায় গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এর বাইরে ছিল না; টাঙ্গাইল, গাইবান্ধা ও কুষ্টিয়ার বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষক ও পরিচালকদের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নির্যাতন বা বলাৎকারের অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে সরাসরি গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এমন একটি ঘটনায় মাদ্রাসাশিক্ষককে উদ্ধার করতে গিয়ে উত্তেজিত জনতার হামলায় তিন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন।
এমএসএফের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অক্টোবরে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে চুরির ঘটনা ঘটেছে ৩৫টি এবং বসতবাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে দুটি। এছাড়া অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রতিশোধমূলক হামলায় বিএনপির চারজন ও আওয়ামী লীগের একজন নিহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা যাচাই এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের, নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।
মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এর পরিচালক এ এস এম নাসির উদ্দিন এলান এ বিষয়ে বলেন, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার সুযোগে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও দায়মুক্তি এই অপরাধকে উৎসাহিত করছে উল্লেখ করে তিনি মব ভায়োলেন্সে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপকভিত্তিক প্রচার চালানোর তাগিদ দেন।
দেশবার্তা/একে