বাংলাদেশের আবাসিক এলাকাগুলোতে দিন দিন বাড়ছে শব্দ দূষণের মাত্রা। একসময়ের শান্ত ও বাসযোগ্য পরিবেশ এখন প্রায় প্রতিনিয়ত উচ্চ শব্দে কেঁপে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নিয়ন্ত্রণহীন শব্দ দূষণ শুধু অস্বস্তি তৈরি করছে না, বরং মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, আবাসিক এলাকায় শব্দের সহনীয় মাত্রা দিনে ৫৫ ডেসিবেল (dB) এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল (dB)। কিন্তু বাস্তবে অনেক এলাকায় এই মাত্রা প্রায়ই ৮০ থেকে ৯৫ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বিশেষ করে কাঠের ফার্নিচার ওয়ার্কশপ, লোহার কারখানা, ছোটখাটো গ্যারেজ, বিল্ডিং নির্মাণ কাজ এবং সড়কে যানবাহনের হর্ন এই শব্দ দূষণের বড় উৎস।
ছোট ওয়ার্কশপগুলোতে প্রতিদিন বিভিন্ন কাটিং মেশিন, ড্রিল, গ্রাইন্ডার, কম্প্রেসার ও ওয়েল্ডিং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়, যেগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা উচ্চ শব্দ সৃষ্টি করে। এসব দোকান বা কারখানার অধিকাংশই অবস্থিত ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায়, যেখানে বয়স্ক, অসুস্থ ও শিশুদের জীবনযাত্রা প্রতিনিয়ত বিঘ্নিত হচ্ছে।
এছাড়া বিল্ডিং নির্মাণ ও সংস্কারের কাজের সময় কংক্রিট মিক্সার, রড কাটার মেশিন, জেনারেটর এবং অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতির উচ্চ শব্দও আবাসিক এলাকাগুলোর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। এমনকি গভীর রাতেও এসব কাজ চলতে দেখা যায়, যা নাগরিকদের বিশ্রাম ও ঘুমকে ব্যাহত করছে।
শব্দ দূষণের আরেকটি বড় উৎস হলো যানবাহনের অযাচিত হর্ন বাজানো, বিশেষ করে বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল। পাশাপাশি রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে মাইক ব্যবহার, হকারদের হ্যান্ড মাইক ও সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোর সাউন্ড সিস্টেমও পরিবেশকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উচ্চ শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, মানসিক অস্থিরতা এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। শিশুরা অতিরিক্ত শব্দে ভীত হয়ে পড়ে এবং তাদের মনোযোগ ও শিক্ষার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
Noise Pollution (Control) Rules, 2006 অনুযায়ী, আবাসিক এলাকায় নির্ধারিত সীমার বেশি শব্দ করা আইনের লঙ্ঘন। পাশাপাশি বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ২৬৮ ও ২৯০ অনুসারে জনবিরক্তি সৃষ্টি বা জনসাধারণের জীবনযাত্রা বিঘ্নিত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে পর্যাপ্ত মনিটরিং ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করেন, শব্দ দূষণ কমাতে আইন প্রয়োগ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক তদারকি জোরদার করা জরুরি।
নাগরিক সমাজের দাবি, সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন একযোগে পদক্ষেপ না নিলে আবাসিক এলাকাগুলো থেকে শান্তি ও স্বস্তি একদিন পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।
প্রতিনিধি/একে