যানজট নিরসন ও শহরের শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যশোর জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটি। লাইসেন্স ছাড়া কোনো ভ্যান বা রিকশা চালানো যাবে না। শুধুমাত্র যশোর পৌরসভার অনুমোদন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সধারীরাই ভ্যান-রিকশা চালাতে পারবেন। বর্তমানে পৌরসভার অনুমোদিত ভ্যান-রিকশার সংখ্যা প্রায় সাত হাজার সাতশ। অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন যানবাহন উচ্ছেদে আগামী মাসের ১ তারিখ থেকে চূড়ান্ত অভিযান শুরু হবে।
রোববার (১৪ জুন) সকালে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান। সভায় মে ২০২৬ মাসের আইন-শৃঙ্খলা কমিটির কার্যবিবরণী এবং জেলার অপরাধচিত্র পর্যালোচনা করে উপস্থাপন করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (রাজস্ব) কমলেশ মজুমদার।
সভায় যানজট নিরসন প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, “যশোর শহরের যানজটের অন্যতম কারণ অপ্রয়োজনীয় ও লাইসেন্সবিহীন ভ্যান-রিকশা। এখন থেকে পৌরসভার অনুমোদিত ভ্যান-রিকশা চালাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও যানবাহনের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। শুধুমাত্র লাইসেন্সধারীরাই ভ্যান বা রিকশা চালাতে পারবেন।”
তিনি আরও নির্দেশনা দেন, স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক (ডিডিএলজি) ও পৌর প্রশাসক সৈয়দ রফিকুল হাসানকে দ্রুত সময়ের মধ্যে মাইকিংয়ের মাধ্যমে বিষয়টি জনগণকে জানাতে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ ও পৌরসভার সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। ওই কমিটি যাচাই-বাছাই করে উত্তীর্ণ ব্যক্তিদের ৭ থেকে ১০ দিনের প্রশিক্ষণ দেবে এবং প্রশিক্ষণ শেষে লাইসেন্স প্রদান করা হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, “আমরা চাই যশোর শহর হোক যানজটমুক্ত ও নান্দনিক। এর জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। লাইসেন্স ছাড়া কেউ রাস্তায় নামলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সভায় পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম বলেন, শহরে প্রবেশের স্থানগুলো চিহ্নিত করে নিয়ন্ত্রণমূলকভাবে যানবাহন প্রবেশ করানো হবে। কোন সময় কোন রুটে কোন ধরনের যানবাহন চলবে তা নির্ধারণ করা হবে। ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হবে এবং রাস্তার দুই পাশের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান জোরদার করা হবে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা সকলের সহযোগিতা চাই। যশোরকে সুন্দর, নান্দনিক ও যানজটমুক্ত শহর হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। নাগরিকদের সচেতনতা ও আইন মানার মানসিকতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
যশোর পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক সৈয়দ রফিকুল হাসান বলেন, যানজট নিরসনে পৌরসভা নিরলসভাবে কাজ করছে। তিনি জানান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং যশোর পৌর পার্কের নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “রাস্তার দুই পাশ দখলমুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান চলবে। পৌরসভার অনুমোদন ছাড়া কোনো ভ্যান-রিকশা রাস্তায় নামতে পারবে না। আগামী মাসের ১ তারিখ থেকে চূড়ান্ত কার্যক্রম শুরু হবে।”
সভায় বিগত মাসের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তা সন্তোষজনক বলে উল্লেখ করা হয়। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কমলেশ মজুমদার মে মাসের অপরাধচিত্র তুলে ধরেন। এতে দেখা যায়, ডাকাতি, ছিনতাই ও মাদক সংক্রান্ত ঘটনা আগের তুলনায় কমেছে। তবে কিশোর গ্যাং ও চোরাচালানের কিছু ঘটনা উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও কঠোর আইন প্রয়োগ করা হবে। মজুদদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। মাদক ও ছিনতাইবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হবে। সীমান্তে চোরাচালান ও পুশইন রোধে বিজিবি ও পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা হবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম, স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক (ডিডিএলজি) ও পৌর প্রশাসক সৈয়দ রফিকুল হাসান, সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা, যশোর জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন, যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হোসেন সাফায়াত, যশোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মিজানুর রহমান খান, প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন, ৪৯ বিজিবির সহকারী পরিচালক সোহেল আল মাহমুদ, র্যাবের এসপি রেজাউল হকসহ জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির অন্যান্য সদস্যরা।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মিজানুর রহমান খান বলেন, “যানজট ব্যবসার জন্য বড় বাধা। পণ্য পরিবহনে দেরি হয়, খরচ বাড়ে। প্রশাসনের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে।”
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান শেষে বলেন, “আইন সবার জন্য সমান। আমরা কাউকে হয়রানি করতে চাই না। তবে শহরের শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর হতে হবে। সবাই মিলে কাজ করলে যশোর হবে দেশের অন্যতম পরিকল্পিত ও যানজটমুক্ত শহর।”
প্রতিনিধি/আরএইচ