ফরিদপুরে একসময় পরিচিত ফল বিলাতি গাব এখন আগের মতো সহজে দেখা যায় না। অপরিকল্পিতভাবে গাছ কেটে ফেলা, নতুন গাছ না লাগানো এবং গ্রামীণ পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে এ ফলের গাছ কমে গেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
বিলাতি গাব দেখতে অনেকটা আপেলের মতো। এর ত্বক হালকা বাদামি ও লোমশ এবং ভেতরের মাংসল অংশ হালকা ক্রিম রঙের। ফলটি স্বাদে মিষ্টি।
সাধারণত জ্যৈষ্ঠ মাসে বিলাতি গাব পাকে। গ্রামাঞ্চলে বাড়ির আশপাশের বন-বাদাড়ে এটি স্বাভাবিকভাবে জন্মে। স্থানীয়দের মতে, রাতে বাদুড় ফল খেয়ে বীজ ছড়িয়ে দেয়। সেই বীজ থেকে সহজেই চারা গজায়। নানা প্রতিকূল পরিবেশেও গাছটি টিকে থাকতে পারে।
গ্রামাঞ্চলে এ ফলের নানা ব্যবহার রয়েছে। কাঁচা অবস্থায় কেউ সবজি হিসেবে রান্না করে খান, আবার কেউ নুন-মরিচ দিয়ে মেখে খান। অপরিপক্ব ফলের ভেতরের কোমল আঁটিও শিশুরা খেয়ে থাকে। পাকা ফলের রং আকর্ষণীয় এবং স্বাদ ও গন্ধও ভালো।
দেশি গাব ও বিলাতি গাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। বিলাতি গাবের ইংরেজি নাম Malobo। একে Korean mango বা Velvet apple নামেও ডাকা হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Diospyros blancoi। এটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটি চিরসবুজ বৃক্ষ।
বিলাতি গাব গাছ সাধারণত ১০ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে গাছে ফুল ফোটে এবং জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়। কাঁচা ফল হালকা সবুজ বা বাদামি হলেও পাকলে উজ্জ্বল বাদামি বা গাঢ় লাল রঙ ধারণ করে। পাকা ফলের ভেতরের অংশ সাদা ও নরম। এ ফল খাওয়ার পাশাপাশি জুস, ডেজার্ট, ফ্রুটকেক ও ক্রিম তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়।
পাকা বিলাতি গাবের প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যযোগ্য অংশে রয়েছে খাদ্যশক্তি ৫০৪ কিলোক্যালরি, জলীয় অংশ ৮৩.০-৮৪.৩ গ্রাম, আমিষ ২.৮ গ্রাম, চর্বি ০.২ গ্রাম, শর্করা ১১.৮ গ্রাম, খাদ্যআঁশ ১.৮ গ্রাম, চিনি ১১.৪৭ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৪৬ মিলিগ্রাম, ভিটামিন এ ৩৫ আইইউ, ফসফরাস ১৮ মিলিগ্রাম, আয়রন ০.৬ মিলিগ্রাম, থায়ামিন ০.০২ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ১৮ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ১১০ মিলিগ্রাম এবং পটাশিয়াম ৩০৩ মিলিগ্রাম।
ফরিদপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে কিছু গাছে গোলাপি রঙের বিলাতি গাব দেখা গেছে, যা স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
ফরিদপুর ফলপট্টিতে কথা হয় গাব বিক্রেতা আবদুল মান্নান মোল্লার সঙ্গে। তিনি বলেন, “এক সময় ফরিদপুর অঞ্চলে বিলাতি গাব পাওয়া যেত। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এখন আর পাওয়া যায় না। যা দু-একটি পাওয়া যায়, তার দামও অনেক। নতুন প্রজন্ম বিলাতি গাবের সঙ্গে তেমন পরিচিত নয়। আমাদের বাড়ির একটি গাছে বিলাতি গাব হয়েছে। সেগুলো বিক্রি করতে এনেছি। প্রতিটি ৫০ টাকা দরে বিক্রি করছি।”
বোয়ালমারী উপজেলার ময়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কালিপদ চক্রবর্ত্তী বলেন, “বিলাতি গাবে অনেক পুষ্টি রয়েছে। খেতেও সুস্বাদু। ফরিদপুরে এক সময় প্রায় সব বাড়িতেই কমবেশি গাব গাছ পাওয়া যেত। এ গাছের গোড়ায় কোনো সার বা ওষুধের প্রয়োজন না হলেও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে পরিচর্যার অভাবে গাব গাছ দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে।”
তিনি আরও বলেন, “গাব গাছের দুটি জাত রয়েছে—দেশি গাব ও বিলাতি গাব। প্রধান পার্থক্য ফলের মধ্যে। বিলাতি গাব সুস্বাদু ও মিষ্টি। অন্যদিকে দেশি গাব হালকা মিষ্টি ও কষযুক্ত। কাঁচা ফল সবুজ এবং পাকলে হলুদ হয়ে যায়।”
প্রতিনিধি/আরএইচ