চলতি বছরের মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে সাতক্ষীরা জেলায় অন্তত ৩৩টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে উত্তরণ-ডিএইচআরএনএস প্রকল্পের আওতায় ৫ জনকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে, ১৭ জনকে চলমান মামলায় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং ৪টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা জিআরও অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে জেলার আটটি থানায় মোট ৬৮৪টি অপরাধের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ডাকাতি ১টি, ডাকাতির প্রস্তুতি ৩টি, দস্যুতা ৩টি, খুন ৯টি, দ্রুত বিচার আইনে ৫টি, ধর্ষণ ২১টি, বিভিন্নভাবে নারী নির্যাতন ৫০টি, শিশু নির্যাতন ৭টি, অপহরণ ৬টি, সিঁধেল চুরি ১১টি, গবাদিপশু চুরি ৩টি, গাড়িচুরি ৩টি, অন্যান্য চুরি ১৩টি, সড়ক দুর্ঘটনায় ৫টি, পর্নোগ্রাফি আইনে ৪টি, সাইবার নিরাপত্তা আইনে ৫টি, অস্ত্র আইনে ৩টি, চোরাচালান আইনে ১২টি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ২৫১টি, চেতনানাশক-সংক্রান্ত ৪টি এবং অন্যান্য খাতে ৩৪২টি মামলা হয়েছে। এর আগের তিন মাসে জেলায় ৬৩২টি অপরাধের মামলা হয়েছিল।
মে মাসে জেলার নারী, শিশু, মানবপাচার ও পিটিশন মিলিয়ে বিচারাধীন মামলা ছিল ৪ হাজার ৩২১টি। জুনে তা বেড়ে ৪ হাজার ৩২৭টি এবং জুলাইয়ে ৪ হাজার ৩৩৭টিতে পৌঁছায়।
মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে জেলায় ১৩৬ জনের অপমৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে মে মাসে ৪৯ জন, জুনে ৪৪ জন এবং জুলাইয়ে ৪৩ জনের অপমৃত্যু হয়। একই সময়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে ৬৫টি। এর মধ্যে মে মাসে ২৬ জন, জুনে ২২ জন এবং জুলাইয়ে ১৭ জন আত্মহত্যা করেন।
শনিবার রাতে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর সহযোগিতায় উত্তরণ-ডিএইচআরএনএস প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত ত্রৈমাসিক সভায় এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এমএসএফের সেক্রেটারিয়াল সাপোর্ট স্টাফ অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ মুনিরুদ্দীন প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন।
সাতক্ষীরার ম্যানগ্রোভ সভাকক্ষে সাতক্ষীরা ডিস্ট্রিক্ট হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার নেটওয়ার্কের অ্যাডভোকেসি ডায়ালগ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ডিস্ট্রিক্ট হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ। তিনি স্বাগত বক্তব্যে সাতক্ষীরার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ধারণাপত্র উপস্থাপন এবং এইচআরডি নেটওয়ার্কের করণীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কারী সোফিয়া হাসিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার এবং মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের মনিটরিং কর্মকর্তা সাহিদ মাহফুজ।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন এইচআরডি নেটওয়ার্কের যুগ্ম আহ্বায়ক মাধব চন্দ্র দত্ত, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুল হামিদ, অধ্যক্ষ পবিত্র মোহন সরকার, সিনিয়র সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জী, জার্নালিস্ট এইচআরডি নেটওয়ার্কের সদস্যসচিব মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জ্বল, অধ্যক্ষ এ আর এম মোবাশ্বেরুল হক জ্যোতি, নারী নেত্রী ও সাবেক কাউন্সিলর ফরিদা আক্তার বিউটি এবং সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম।
সভায় গত তিন মাসের ঘটনার ওপর প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এতে ডিস্ট্রিক্ট হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার নেটওয়ার্কের অর্জন এবং সাতক্ষীরায় নিরীহ ও সাধারণ মানুষের ওপর বিভিন্নভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরা হয়।
প্রধান অতিথি বলেন, “বাংলাদেশে বর্তমান মানবাধিকরা পরিস্থিতি আমাদের কাজকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরী করে তুলেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার তথ্য অনুযায়ী রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনী, সংখ্যালঘু নির্য়াতন অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার, এবং নারীর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের এপিল মে জুন ৩ মাসে মবের মাধ্যমে ১৯৬টি ঘটনায় ৮৬ জন নিহত এবং ২৪৬জন আহত হয়েছেন। একইভাবে সংখ্যালঘু জনগোষ্ট্রির উপর ধারাবাহিক হামলা এবং সহিংসতার ঘটনাও আমাতের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে নেটওয়ার্ককে মানবাধিকার লঙ্ঘন মনিররিং, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট করা, প্রতিবাদ সংগঠিত করতে হবে। অভিযুক্তের শাস্তি নিশ্চিত করা, ভিকটিম সাপোর্ট করা, এবং এডভোকেসী প্রসাশসনের সাথে সমন্বয় করা। মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনা শুধুমাত্র একটি সংখ্যা নয় এটি একটি মানুষের জীবন, একটি পরিবারের কষ্ট, একটি সমাজের ব্যর্থতা রাষ্ট্রের অযোগ্যতা প্রমান করে। সেকারণে এ থেকে উদ্ধার হতে সকলেই মিলে একসাথে কাজ করতে হবে।”
অন্যান্য বক্তারা সাতক্ষীরার মানবাধিকার পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে সাতক্ষীরা জজ কোর্টের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দীর্ঘদিন বিচারক না থাকায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ফাইলিং ও বিচারকাজ ব্যাহত হওয়ায় বহু নারী অধিকারবঞ্চিত হচ্ছেন বলে তারা উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে আগামী ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জজ কোর্টের সামনে মানববন্ধন এবং সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় স্থানীয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের সূত্র তুলে ধরে বলা হয়, মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে সাতক্ষীরা জেলায় মোট ৬৮ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি আহত হয়েছেন এবং সুন্দরবনে মাছ ধরার সময় মুক্তিপণের দাবিতে ৩২ জন জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠন ‘উত্তরণ’-এর ডিস্ট্রিক্ট হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার নেটওয়ার্ক (ডিএইচআরএনএস) প্রকল্পের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। আঞ্চলিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তৈরি তথ্য বিবরণীতে জেলার আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন মাসে সর্বাধিক ১৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মে মাসে ৩টি, জুনে ৫টি এবং জুলাইয়ে ৭টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন, যার মধ্যে মে মাসে ৪ জন এবং জুলাইয়ে ২ জন। আত্মহত্যা ও মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে ৯টি। এ ছাড়া বজ্রপাত ও ঝড়ে ৮ জন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ৭ জন, পানিতে ডুবে ৯ জন, সাপের কামড়, ভীমরুলের আক্রমণ ও বিদেশে ড্রোন হামলায় মিলিয়ে ৬ জন, গাছ ও ছাদ থেকে পড়ে ৫ জন, কারাগারে ১ জন, পিলার ও দেয়ালচাপায় ১ জন এবং বমি করে অস্বাভাবিকভাবে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জুন মাসে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে দুই বাংলাদেশি নাগরিক আহত হন। অন্যদিকে সুন্দরবন এলাকায় মে থেকে জুলাই—এই তিন মাসে মাছ ধরার সময় মুক্তিপণের দাবিতে ডাকাতদের হাতে ৩২ জন জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন। তথ্য বিবরণী বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেলায় প্রতি মাসে গড়ে ২২টির বেশি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহল ও মানবাধিকারকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন এইচআরডি নেটওয়ার্কের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মুনিরুদ্দীন।
প্রতিনিধি/আরএইচ