বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং কৃষি উপকরণ ও খাদ্যের বাড়তি দামের কারণে দেশে কৃষি সংকট আরও গভীর হচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, চলতি বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশের প্রায় ১০ লাখ কৃষি পরিবারের (আনুমানিক ৫০ লাখ মানুষ) জরুরি কৃষি সহায়তা প্রয়োজন হবে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের হিসাবের তুলনায় এ সংখ্যা আরও ২ লাখ বেড়েছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র পরিসরের কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
সংস্থাটির জরুরি পরিস্থিতিতে তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের ১৪তম পর্যায়ের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ মূল্যায়নটি চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে দেশের ৬ হাজার ১৪৩টি পরিবারের সঙ্গে কম্পিউটারচালিত টেলিফোন সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়।
অর্থনৈতিক, ব্যক্তিগত, কৃষিসংক্রান্ত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে খাদ্য অনিরাপত্তায় পড়া এবং কৃষি সহায়তার আকুতি জানানো পরিবারগুলোকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে সহায়তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়তা দেখা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর মধ্যে ৮৪ শতাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার পরিবারের হার পৌঁছেছে ১৬ শতাংশে, যা আগের জরিপের চেয়ে ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। জরিপে দেখা গেছে, প্রতি তিনটি পরিবারের মধ্যে দুটি পরিবার বাকিতে খাদ্য কিনে সংসার চালাচ্ছে।
চলমান সংকট সামলাতে ৬৬ শতাংশ পরিবার স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমিয়েছে এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবার চলতি মৌসুমের ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বীজ ও সার কেনার বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে নগদ সহায়তার আবেদন করা পরিবারের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ১৩তম পর্যায়ে জরিপে নগদ সহায়তার আবেদন করা পরিবারের হার ছিল ১৬ শতাংশ, যা ১৪তম পর্যায়ে এসে ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে নদী অববাহিকা, হাওর এবং আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে সহায়তার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। বর্ষা মৌসুমের তীব্রতার সাথে এসব অঞ্চলে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এফএও উল্লেখ করেছে, বর্ষার বন্যা, মূল্যস্ফীতি এবং আয় কমে যাওয়া- এই তিনটির যৌথ চাপ পরিবারগুলোকে চরম সংকটে ফেলেছে।
ফসল উৎপাদনকারী পরিবারগুলোর মধ্যে প্রায় অর্ধেক পরিবারই উৎপাদনজনিত জটিলতার কথা জানিয়েছে। জমিতে অতিরিক্ত পানি থাকা, ফসলের রোগবালাই এবং সারের সংকট ছিল প্রধান সমস্যা। এর পাশাপাশি উৎপাদিত ফসল কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার তথ্য জানিয়েছে ৩০ শতাংশ পরিবার, যা আগের জরিপের (৯ শতাংশ) তুলনায় তিন গুণেরও বেশি।
পশুপালন খাতের পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি মিললেও জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি। গবাদিপশু পালনকারী ৯১ শতাংশ পরিবার পশুর রোগবালাই এবং ১৭ শতাংশ পরিবার পশুখাদ্যের অতিরিক্ত দামের কথা উল্লেখ করেছে।
এই পরিস্থিতিতে এফএও আমন মৌসুম শুরুর আগেই সময়োপযোগী কৃষি উপকরণ সরবরাহে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য নগদ অর্থ সহায়তা, পশুর স্বাস্থ্যসেবা এবং পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
দেশবার্তা/একে