সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বা শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বকে নিশানা করে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পোস্ট ও কনটেন্ট ছড়িয়ে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে মনগড়া তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ-সংশয়ের বীজ বুনছে সংঘবদ্ধ চক্র। আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে নকল ছবি তৈরি এবং অসত্য বা খণ্ডিত তথ্য দিয়ে চমকপ্রদ স্ক্রিপ্ট সাজাচ্ছেন তারা। যা পরে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এতে মুহূর্তের মধ্যেই ওইসব ভিডিও বা পোস্ট পৌঁছে যাচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে। এর ফলে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ছেন এক শ্রেণির সাধারণ মানুষ।
রিউমার স্ক্যানারসহ তথ্য যাচাইকারী একাধিক প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট উঠে এসেছে— সেনাবাহিনী প্রধান বা সরাসরি সেনাবাহিনীকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়ানো তথ্যের অধিকাংশই এআই নির্মিত এবং ভিত্তিহীন। মনগড়া তথ্য জুড়ে দিয়ে তৈরি করা এসব কন্টেন্ট বা পোস্ট কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন সাইবার অপরাধ বা সাময়িক অপচেষ্টা নয়; বরং এর মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে ক্ষতিগ্রস্ত বা রাষ্ট্রকে দুর্বল করা সুসংগঠিত তৎপরতা বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিভ্রান্তিকর, ভুয়া বা আংশিক সত্য তথ্য দিয়ে উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে পোস্ট-কন্টেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সবচেয়ে বেশি টার্গেট করা হয়েছে। শুধু সেনাবাহিনী নয়, একইভাবে টার্গেট করা হচ্ছে নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। ফলে সশস্ত্র বাহিনীর মতো রাষ্ট্রের এমন গুরুত্বপূর্ন কাঠামোকে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর ঘটনাগুলোকে জনগণের আস্থা নষ্ট করার অপচেষ্টা হিসেবে দেখছেন সামরিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। সচেতন নাগরিকরাও প্রশ্ন তুলছেন, কেন বারবার দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে পরিচিত সেনাবাহিনীকে টার্গেট করে এমন বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য ছড়ানো হচ্ছে? এগুলো কি শুধুই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি এনগেজমেন্ট বা ভিউ ব্যবসার প্রতিযোগিতা, নাকি কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নের গভীর প্রক্রিয়া।
রিউমার স্ক্যানারের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বাহিনীর উচ্চপদস্থ নেতৃত্বকে ঘিরে অন্তত ৯৬টি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যাটি ছিল ৭৪। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে প্রচারিত অপতথ্য ও গুজবের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। একই সময়ে সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে সরাসরি নিশানা বানিয়ে ২১টি সুনির্দিষ্ট ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে, যা নিরপেক্ষ ফ্যাক্টচেকিংয়ে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া বলে প্রমাণিত হয়। শুধু সেনাবাহিনী নয়, সামগ্রিকভাবে সশস্ত্র বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ১৯৫টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমার স্ক্যানার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা ও সামরিক বাহিনীকে ঘিরে ছড়ানো অপপ্রচারের এই হার বেড়েছে প্রায় ৭১ শতাংশ। সম্প্রতি সময়েও সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীকে নিয়ে বা শীর্ষ কর্মকর্তাদের টার্গেট করে বিভ্রান্তিকর পোস্ট ও কন্টেন্ট প্রকাশ করা হয় ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক স্বার্থ বা সামাজিক মাধ্যমে উন্মাদনা তৈরির উদ্দেশ্যে বহুল আলোচিত ‘এক্টিভিস্টি’ ও ইউটিউবার ইলিয়াস হোসাইন তার প্রকাশিত ‘১৫ মিনিটস’ নামক ভিডিওকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তিকর তথ্য তুলে ধরেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ওই ভিডিওতে দাবি তোলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নাকি সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে ‘ভারতপন্থী’ ব্যক্তিদের বসানোর চেষ্টা চলছে। শুধু তা-ই নয়, একই ভিডিওতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের একটি কথিত গোপন পরিকল্পনার দাবিও সামনে আনা হয়েছিল।
যদিও ইউটিউবার ইলিয়াস হোসাইনের তোলা এসব চাঞ্চল্যকর অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য, কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা প্রশাসনিক দলিল, এমনকি কোনো তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। মূলত, এসব বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে সশস্ত্র বাহিনী তথা শীর্ষ নেতৃত্বকে হেয় করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপতৎপরতা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তবতা বা ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— অপপ্রচারকারীদের এসব কাল্পনিক দাবির সঙ্গে প্রকৃত পরিস্থিতির কোনো সম্পর্ক নেই। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান যে অপরিসীম ধৈর্য, পেশাদারত্ব ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়। চব্বিশের ৫ আগস্ট তৎকালীন সরকার প্রধানের পদত্যাগের পর দেশে যখন এক গভীর প্রশাসনিক শূন্যতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তখন সমস্ত ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা সত্ত্বেও সেনাবাহিনী সরাসরি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেনি। বরং সেনাপ্রধান প্রকাশ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং সংবিধান ও রাষ্ট্রপতির নির্দেশনা অনুযায়ী একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়াকে বেগবান করেন। তিনি দেশবাসীকে শান্ত থাকার ও সহিংসতা বন্ধ করার সরাসরি আহ্বান জানান।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা আরও বলেন, ওই আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্তে আন্দোলনরত সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছিল, আন্দোলনের শেষ মুহূর্তে সেনাপ্রধান স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, সাধারণ নাগরিকদের ওপর কোনো বলপ্রয়োগ করা হবে না। সামরিক নেতৃত্বের এই দায়িত্বশীল ও রক্তপাতহীন অবস্থানের কারণেই দেশে এক সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়। অন্যদিকে সেনাবাহিনী সবসময় একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথকেই সমর্থন জুগিয়ে এসেছে। সেনাপ্রধান প্রকাশ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা বলেছিলেন। শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় সশস্ত্র বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষক এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, এই অপপ্রচার ও গুজবের মূল উদ্দেশ্য হলো একটা দেশকে সার্বিকভাবে অস্থিতিশীল করার জন্য এবং ব্যক্তি বিশেষের উপর আক্রোশ এবং বিভিন্ন বাহিনীর উপর প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে কিছু ব্যক্তিবর্গ এই সমস্ত বিষয়গুলি করছে। এগুলো যা কিছু হচ্ছে তাহলো রাষ্ট্র যাতে স্বাভাবিক না থাকতে পারে একটা অস্বাভাবিকতার মধ্যে যায় একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করার জন্য এই ধরনের মোটিভেশন কাজ করছে। এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ গোষ্ঠী এই কাজগুলি করছে এবং উদ্দেশ্যপ্রণভাবে এটা করা হচ্ছে। এএটা দিয়ে ব্যক্তিবিশেষকে হেয়-প্রতিপন্ন করা হচ্ছে বাহিনীগুলিকে স্বতঃস্পরতা ডিমোরালাইজ করার জন্য এটা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এটার অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে বিভিন্ন খন্ডিত রাজনৈতিক যে দলগুলি আছে তারা এই কাজগুলি করছে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়কালের সামগ্রিক ডিজিটাল চিত্র পর্যালোচনায় রিউমার স্ক্যানার দেশজুড়ে মোট ৩ হাজার ২১০টি অপতথ্য শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এসব তথ্যের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া প্রচারণার পাশাপাশি বেশ কিছু বিভ্রান্তিকর উপাদানও বিদ্যমান ছিল। ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো জনপ্রিয় সব ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে প্রতিনিয়ত আপলোড হওয়া তথ্যের একটি বড় অংশই ফরেনসিক বিশ্লেষণে মিথ্যা অথবা বিকৃত হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। প্ল্যাটফর্মভিত্তিক উপাত্তে আরও দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২ হাজার ৮২২টি অপতথ্য ফেসবুকে, ৬০০টি টিকটকে, ৫৬২টি ইনস্টাগ্রাম এবং ২৪৫টি ইউটিউবে ছড়িয়েছে। সেনাপ্রধান বা সামরিক বাহিনীর সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে তৈরি একটি বিভ্রান্তিকর বার্তা দ্রুততার সঙ্গে এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে ছড়ানোর ফলে অতি অল্প সময়েই তা বিপুলসংখ্যক ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে এটি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রযুক্তিনির্ভর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কোনো ঊর্ধতন কর্মকর্তার পদায়ন, পদোন্নতি হলেই টার্গেট করে সত্য-মিথ্যা যুক্ত করে চমৎপ্রদ পোস্ট বা ভিডিও কন্টেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুধু ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই সারাদেশে ৯৩টি এআই-নির্মিত ভুয়া উপাদান শনাক্ত করা হয়, যার একটি বড় অংশ ছিল সেনাবাহিনী ও এর নেতৃত্বকে নিশানা করে তৈরি।
রিটায়ার্ড আর্মি ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের (রাওয়া) চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) মো. আব্দুল হক বলেন, যারা এই সামলোচনাগুলো করছে এর কোন ভিত্তি নেই। সেনাবহিনীর মান ক্ষুন্ন করার জন্য সেনাবহিনীকে মানুষের কাছে অগ্রহনওেযাগ্য করার জন্য এসব করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইন্ডিয়া বা বিদেশে বসে করা হচ্ছে। এর পেছনে প্রতিবেশি দেশের ইন্ধন আছে। এক্ষেত্রে তিনি মনে করেন দেশের ভাবমুর্তি তথা সেনাবহিনীকে দুর্বল করার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে।