শিক্ষকতা তার পেশা, আর কৃষি তার নেশা। চাকরির ব্যস্ততার মধ্যেও কৃষিকে ভালোবেসে চার বিঘা জমিতে ড্রাগন ফলের বাগান গড়ে সফল উদ্যোক্তা হয়েছেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের আবদার দক্ষিণপাড়া এলাকার শিক্ষক ফারুক আহমেদ।
দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, ধৈর্য ও পরিকল্পিত পরিচর্যায় তার বাগানে এখন প্রতি সপ্তাহে শত শত কেজি ড্রাগন ফল উৎপাদিত হচ্ছে। বছরে ফল বিক্রি করে প্রায় ২০ লাখ টাকা আয় হলেও সব খরচ বাদ দিয়ে তার নিট আয় প্রায় ১৪ লাখ টাকা।
ফারুক আহমেদ তেলিহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি ফরিদপুর গ্রামের ওয়াজ উদ্দিনের ছেলে। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজস্ব উদ্যোগে কিছু করার ভাবনা থেকে কয়েক বছর আগে ড্রাগন চাষে আগ্রহী হন। পরে ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে আবদার গ্রামের শাহিদ মেম্বারের কাছ থেকে চার বিঘা জমি ১০ বছরের জন্য সাড়ে তিন লাখ টাকায় লিজ নেন।
জমি লিজ নেওয়ার পর শুরু হয় বাগান তৈরির কাজ। ড্রাগন চাষের জন্য সারিবদ্ধভাবে পিলার নির্মাণ করা হয়। বাগানের প্রাথমিক অবকাঠামো তৈরিতে প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয় হয়। মোট সাড়ে ৭৫০টি পিলারে প্রতিটিতে চার থেকে পাঁচটি করে চারা রোপণ করা হয়। শুরুতে প্রায় চার হাজার চারা দিয়ে বাগান শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে গাছের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে বাগানে প্রায় লক্ষাধিক ড্রাগন চারা রয়েছে বলে জানান ফারুক আহমেদ।
তবে শুরুটা সহজ ছিল না। প্রথম বছর বাগান তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কোনো ফলন পাননি তিনি। হতাশ না হয়ে নিয়মিত পরিচর্যা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সার প্রয়োগ ও সেচ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেন। দ্বিতীয় বছর থেকে ফলন শুরু হয়। এরপর প্রতি বছর উৎপাদন বাড়তে থাকে।
বর্তমানে তার বাগান থেকে সপ্তাহে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি ড্রাগন ফল সংগ্রহ করা হয়। পাইকারি বাজারে গড়ে প্রতি কেজি ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়। বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৮ টন ড্রাগন ফল উৎপাদিত হচ্ছে। এতে বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২০ লাখ টাকা।
সার, শ্রমিকের মজুরি, গাছের পরিচর্যা, সেচ ও অন্যান্য খাতে বছরে প্রায় ৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে আনুমানিক ১৪ লাখ টাকা আয় করছেন তিনি।
ফারুক আহমেদ বলেন, ড্রাগন চাষে শুরুতে বিনিয়োগ বেশি হলেও একবার বাগান দাঁড়িয়ে গেলে নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ফলন পাওয়া যায়। শুরুতে ফল না পাওয়ায় অনেকেই নিরুৎসাহিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ধৈর্য ধরে বাগানের পরিচর্যা চালিয়ে গেছেন। এখন বাগান থেকে নিয়মিত ফলন ও আয় আসায় তার সেই পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিকে বেছে নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজের সময়কে কাজে লাগানো এবং কৃষিতে নতুন কিছু করা। ড্রাগন চাষে সফলতা পাওয়ার পর তিনি মনে করেন, পরিকল্পিতভাবে উচ্চমূল্যের ফল চাষ করতে পারলে কৃষি শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, লাভজনক ব্যবসায়ও পরিণত হতে পারে।
ফারুকের বাগানে উৎপাদিত ড্রাগন ফলের আকার, স্বাদ ও মিষ্টতা ভালো হওয়ায় স্থানীয় বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। ফল পাকার মৌসুমে বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা বাগানে এসে ফল সংগ্রহ করেন। অনেক সময় বাজারে নেওয়ার আগেই বাগানের সব ফল বিক্রি হয়ে যায়। এতে বাজারজাতকরণেও বড় ধরনের ঝামেলায় পড়তে হয় না।
বাগানটি ঘুরে দেখা যায়, চার বিঘা জমিজুড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য পিলার। প্রতিটি পিলার ঘিরে বেড়ে উঠেছে ড্রাগন গাছ। কোথাও সবুজ ডালপালা, কোথাও ঝুলছে পাকা ফল। পুরো বাগানজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে ভিন্ন এক কৃষি পরিবেশ। এ দৃশ্য দেখতে স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও অনেক মানুষ আসছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগেও এ জমিতে প্রচলিত কৃষিকাজ হতো। বর্তমানে সেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে ড্রাগন চাষ হচ্ছে। শিক্ষক ফারুক আহমেদের উদ্যোগ দেখে এলাকার অনেকেই এখন উচ্চমূল্যের ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তাদের মতে, কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি ও নতুন জাতের ফলের চাষ বাড়ানো গেলে কৃষকের আয়ও বাড়বে।
বাগানসংশ্লিষ্টরা জানান, ক্ষতিকর কেমিক্যালের ব্যবহার এড়িয়ে নিরাপদ পদ্ধতিতে ড্রাগন ফল উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে। গাছের পরিচর্যা থেকে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুতেই নিয়ম মেনে কাজ করা হয়। এ কারণে বাগানের ফলের মানও ভালো হচ্ছে এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা বলেন, শ্রীপুর উপজেলায় বর্তমানে প্রায় পাঁচ হেক্টর জমিতে ড্রাগনের বাগান রয়েছে। ড্রাগন ফল শুধু খাওয়ার জন্য নয়, এটি দিয়ে জেলি, শরবতসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা সম্ভব।
তিনি বলেন, তেলিহাটি ইউনিয়নের আবদার গ্রামের ফারুক আহমেদের ড্রাগন বাগানটি কৃষি অফিস নিয়মিত তদারকি করছে। নিরাপদ ও কেমিক্যালমুক্ত পদ্ধতিতে ড্রাগন চাষের মাধ্যমে কীভাবে উৎপাদন আরও বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, বাগানের পরিচর্যা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে ড্রাগন ফলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ফলে সঠিক জাত নির্বাচন, উন্নত পরিচর্যা, আধুনিক চাষপদ্ধতি ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে এ ফলের বাণিজ্যিক চাষ কৃষকদের জন্য লাভজনক হতে পারে। শিক্ষক ফারুক আহমেদের চার বিঘার বাগান সেই সম্ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ।
শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিতে সফলতা অর্জন করে ফারুক আহমেদ এখন স্থানীয়দের কাছে শুধু একজন শিক্ষক নন, একজন কৃষি উদ্যোক্তাও। তার বাগানের সাফল্য প্রমাণ করছে, ইচ্ছা, শ্রম ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে চাকরির পাশাপাশি কৃষিতেও সফলতা অর্জন করা সম্ভব।
প্রতিনিধি/আরএইচ