বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর বাড়ছে চাপ। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে অন্তত ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮টি সন্দেহভাজন হামের ঘটনা এবং হাম ও হামের উপসর্গে ১ হাজার ৪৪ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস)। মৃতদের বড় অংশই দুই বছরের কম বয়সী এবং টিকা না পাওয়া শিশু।
বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’ এর এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে ২০০৫ সালের পর সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামের প্রাদুর্ভাব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ডিজিএইচএসের হিসাবে, ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮টি সন্দেহভাজন সংক্রমণের মধ্যে পরীক্ষাগারে ২০ হাজার ২৮২টি ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে ১ হাজার ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে- এর মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হামের কারণে এবং ৯৪৪ জন মারা গেছেন হামের মতো উপসর্গ নিয়ে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের বাইরে থাকা সব রোগী পরীক্ষা না করায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি হিসাবের বাইরেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা থাকতে পারে। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসা ও টিকার সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক ঘটনা নজরের বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যানের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে টিকা না পাওয়া শিশুদের ঘনত্বও পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
একসময় টিকাদানে সাফল্যের উদাহরণ
বাংলাদেশ একসময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে হামের প্রথম ডোজের টিকা পাওয়ার হার ছিল ৯৭ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের ক্ষেত্রে ৯৩ শতাংশ। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর বাংলাদেশে হামের আক্রান্তের সংখ্যা ১০০ থেকে ৩০০-এর মধ্যে ছিল।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির জনসংখ্যা ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ আয়েশা মাহমুদ ‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’কে বলেন, বাংলাদেশে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয় ক্লিনিকের মাধ্যমে টিকাদান এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরির দীর্ঘদিনের শক্তিশালী ব্যবস্থা ছিল।
তবে কয়েক বছরে সেই ব্যবস্থায় একাধিক বাধা তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত শিশুদের টিকাদান কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে। এরপর ২০২৪ সালে টিকা সংগ্রহের দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির অর্থায়ন কমে যাওয়ায় স্বাস্থ্যকর্মী ও সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার কথাও বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন।
টিকাদানে বড় ঘাটতি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে হামের টিকাদানের হার ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। ইউনিসেফের একটি মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রায় ৪ লাখ শিশু হামের জন্য প্রয়োজনীয় সব ডোজ পায়নি। এর মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার শিশু কোনো টিকাই পায়নি। টিকাদানে এই ঘাটতির সঙ্গে শিশুদের অপুষ্টি, শহরাঞ্চলের অতিরিক্ত জনঘনত্ব এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য যোগাযোগ গবেষক এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের সাবেক কর্মকর্তা শাকিল ফয়েজউল্লাহ বলেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে সামান্য বিচ্যুতিও হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেয়।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মহামারি বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম মস পরিস্থিতিকে একাধিক কারণের সম্মিলিত ফল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, বিভিন্ন ধরনের ঘাটতি একসঙ্গে কাজ করায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
জরুরি টিকাদান অভিযান
সংক্রমণ বাড়তে থাকায় চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে বড় পরিসরে জরুরি হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। এর পর সংক্রমণের গতি কিছুটা কমার লক্ষণ দেখা গেলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সব এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি সমান নয়।
উইলিয়াম মসের মতে, জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের গড় হার তুলনামূলক ভালো দেখালেও কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় টিকা না পাওয়া শিশুদের বড় একটি অংশ থেকে গেলে সেখান থেকেই আবার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে শুধু জাতীয় গড় নয়, স্থানীয় পর্যায়ে টিকাদানের ঘাটতিও চিহ্নিত করা জরুরি।
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। আক্রান্তদের মূলত সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয়। রোগটি সাধারণত জ্বর, সর্দি ও শরীরে লালচে র্যাশ দিয়ে শুরু হলেও গুরুতর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া কিংবা মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে।
৯৫ শতাংশ টিকাদানের লক্ষ্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণ ঠেকাতে জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় টিকাদানের সামান্য ঘাটতিও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। দুই ডোজ টিকা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতেও সাম্প্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ বেড়েছে। তবে এসব দেশের পরিস্থিতির কারণ এক নয়।
‘সায়েন্টিফিক আমেরিকান’-এর প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশে টিকা সরবরাহ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিঘ্ন বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে টিকা সহজলভ্য হলেও কিছু এলাকায় টিকা না নেওয়া বা টিকা নিতে অনীহা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে টিকাদান কর্মসূচিকে ধারাবাহিক ও স্থিতিশীল রাখার গুরুত্বই সামনে এসেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাঁদের মতে, জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি যেসব এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি রয়েছে, সেসব অঞ্চলে লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি। তা না হলে সংক্রমণ কমে এলেও নতুন করে স্থানীয় পর্যায়ে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।
দেশবার্তা/এসআইএস/একে