একসঙ্গে ডেঙ্গু ও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা চরম চাপের মুখে পড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু রোগীর তীব্র বৃদ্ধির পাশাপাশি আগস্ট থেকে শুরু হওয়া হামের সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শঙ্কা, চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ কিংবা আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ডেঙ্গুর প্রকোপ শীর্ষে পৌঁছাতে পারে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ১৬ সেপ্টেম্বর এক দিনেই দেশের হাসপাতালগুলোয় হাম ও ডেঙ্গু মিলিয়ে ভর্তি ছিলেন ১০ হাজার ১২১ জন রোগী। এর মধ্যে হামে আক্রান্ত ৫ হাজার ৯৫ ৯ জন এবং ডেঙ্গু রোগী ছিলেন ৪ হাজার ১৬৬ জন। ওই দিন দেশের মোট নিবন্ধিত শয্যার প্রায় ১৬ ভাগের এক ভাগই দখল করে রেখেছিলেন এই দুই ব্যাধির রোগীরা। অথচ গত বছরের ডেঙ্গু চিকিৎসায় বড় ভূমিকা রাখা ডিএনসিসি হাসপাতালকে এ বছর কেবল হামের চিকিৎসাকেন্দ্র ঘোষণা করায় অন্য হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ বহুগুণ বেড়েছে।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। ১ হাজার ৩৫০ শয্যার এই হাসপাতালে ডেঙ্গুর জন্য ১৯১টি শয্যা নির্ধারিত থাকলেও সম্প্রতি চিকিৎসাধীন ছিলেন ২৪৭ জন রোগী। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরুষ সার্জারি ও গাইনি ওয়ার্ডের মতো সাধারণ চিকিৎসাসেবার জায়গাগুলোকে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রূপান্তর করতে হয়েছে। শয্যা না পেয়ে শত শত রোগীকে ঠাঁই নিতে হচ্ছে হাসপাতালের মেঝে বা বারান্দায়।
একই চিত্র মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও। ৫০০ শয্যার অনুমোদনপ্রাপ্ত এ হাসপাতালে ১ হাজার ৩১৪ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন, যা মূল ধারণক্ষমতার আড়াই গুণেরও বেশি। এর মধ্যে ২১৮ জন ডেঙ্গু ও ৫৩ জন হামের রোগী। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য তিনটি আলাদা তলা বরাদ্দ করা হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবলসংকটে অধিকাংশ রোগীকে মেঝেতে তোষক বিছিয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকার বাইরে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও চাপ বাড়ছে। ঝালকাঠি ১০০ শয্যার জেলা হাসপাতালে ধারণক্ষমতার বেশি রোগী ভর্তি থাকায় সেখানে ২৮টি অস্থায়ী এবং ১২টি আলাদা ডেঙ্গু শয্যা প্রস্তুত করতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কেবল সরকারি এবং নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য নিয়ে এই পরিসংখ্যান তৈরি করায় বাস্তবে মোট আক্রান্তের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।
হাসপাতালগুলোতে এমন তীব্র সংকটের মধ্যেও বাড়তি জনবল এখনো অপর্যাপ্ত বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জনবল ঘাটতির কথা স্বীকার করে শহিদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক নন্দ দুলাল সাহা জানান, রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে সাধারণ ওয়ার্ড কিংবা মেঝেতে জায়গা করে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, যা হাসপাতালের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একসঙ্গে দুই রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তারা স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরে সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘উদাহরণস্বরূপ, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্প্রতি ১০০টিরও বেশি শয্যা যুক্ত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও শয্যা বাড়ানো হবে।’
জনবল সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা গত দুই-তিন দিনে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৩ জন অতিরিক্ত চিকিৎসক দিয়েছি। এছাড়া আরও নার্স ও কর্মী দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’
ডা. বিশ্বাস আরও বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির বিষয়টি তাদের আগেই জানা ছিল এবং হাসপাতালগুলোকে বাড়তি জায়গা প্রস্তুত রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘এই সময়ে ডেঙ্গু রোগীর এমন তীব্র বৃদ্ধি অনুমিত ছিল। তাই আমরা আগে থেকেই হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলাম, তারাও সে অনুযায়ী কাজ করছে। এখন পরিস্থিতি কেমন হয়, তার ওপর বাকিটা নির্ভর করছে।’
তিনি জানান, রোগীর সংখ্যা যদি আরও বাড়ে, সেক্ষেত্রে সরকার ফিল্ড হাসপাতাল বা অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরির কথাও ভাবছে।
ডা. বিশ্বাস বলেন, ‘পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের সেবার ধরনে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। এটাই এখনকার বাস্তব চিত্র। তবে আমরা অবশ্যই রোগীদের, বিশেষ করে যাদের জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন, তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’
দেশবার্তা/একে