দুটি সুন্দর মৃত্যু : আমার পিতা সৈয়দ শাহ্ মোঃ মোনায়েমের পিতা অর্থাৎ আমার দাদা সৈয়দ শাহ্ ওয়াঝিউল্লাহ্ উচ্চ ভরের একজন ওলী ছিলেন। (নিবাস আজিমপুর বড় দায়রা শরীফ, ঢাকা)। দাদা কঠিন রিয়াজাতে নিয়োজিত থাকতে থাকতে একসময় অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সময়টা ছিল ১৪ই মুহাররম, ১৭৩৭ হিজরি।
সেই অসুস্থ অবস্থায় নামাজ ও সর্বক্ষণ আল্লাহ্র জিকিরে মশগুল থাকলেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। বুঝতে পারলেন অন্তিমকাল আসন্ন। দাদা বড় বাবা সৈয়দ শাহ্ খলিলুল্লাহ্ (দায়রা শরীফের গদ্দিনিশীন ছিলেন) উনার কাছেই বায়াত হয়েছিলেন। বড় বাবা উনার এই ছোট ছেলেকে সৈয়দ শাহ্ ওয়াঝিউল্লাহ্ পরবর্তী গদ্দিনিশীন হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।
বিধির বিধান, পিতার বর্তমানেই সৈয়দ শাহ্ ওয়াঝিউল্লাহ্র পরকালের ডাক এসে গেল। মাগরিবের নামাজ শেষ। আস্তে আস্তে সন্ধ্যার অন্ধকারে চারদিক ছেয়ে গেল। দাদা (সৈয়দ শাহ্ ওয়াঝিউল্লাহ্) তার পিতাকে দেখার জন্য আকুল হয়ে উঠলেন। বড় বাবা (সৈয়দ শাহ্ খলিলুল্লাহ্) খবর পেয়ে দ্রুত ছেলের কাছে চলে আসলেন ও মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। দাদা কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, ‘হে, মোর প্রাণপ্রিয় আব্বা, আমার পীর, আপনাকে ভালোভাবে দেখতে পারছি না, আরো কাছে আসুন। আমি তো আল্লাহর শানে মিলিত হতে যাচ্ছি।’
দাদী তার ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে অঝোর ধারায় কান্না করছেন। আমার দাদী উম্মে হোসেন সৈয়দা ফাতেমা বেগম ছিলেন পরমা সুন্দরী, ফরিদপুরের গিরদা নবাব বাড়ির মেয়ে। দাদী কাঁদতে কাঁদতে আকুল হয়ে দাদাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি কোথায় যাবো?’ দাদা উত্তরে বললেন, ‘তুমি আমার কাছে সাত দিনের মধ্যে চলে আসবে।’
এরপর দাদা আস্তে আস্তে নির্জীব হয়ে আল্লাহ্র দিদার হয়ে গেলেন। মরহুম সৈয়দ শাহ্ ওয়াঝিউল্লাহ্ আমার দাদা চিরনিদ্রায় পরম নিশ্চিন্তে আজিমপুর বড় দায়রা শরীফের মাজারের ভিতর শায়িত আছেন। আমার দাদী ঠিক সাত দিন পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ধরাধাম ছেড়ে চলে গেলেন। মরহুম সৈয়দ শাহ্ মোঃ মোনায়েম (ওরফে শাহজাদা) আমার পিতা, বয়স তখন সাত বছর। পিতা-মাতাহীন এতিম হয়ে গেলেন। নতুন এক জীবনযাত্রা শুরু। আব্বা তাঁর চাচা সৈয়দ শাহ্ লাকিভতুল্লাহর তত্ত্বাবধানে চলে গেলেন।
সেই শৈশব, কৈশোর, যৌবন- মাদরাসাভিত্তিক সমস্ত ডিগ্রি লাভ করে চাকরি জীবন শুরু করেন। আব্বা ছিলেন শরিয়তের পায়বন্দ। পরিধান করতেন ধবধবে সাদা পাগড়ি, সাদা পাঞ্জাবি, সাদা পায়জামা। শুক্রবারে পরিধান করতেন কালো আবা ও বিভিন্ন রঙের পাগড়ি। শরীরের রংটা ছিল লাল ও হরিদ্রা বর্ণের মিশ্রণ। আব্বা ছিলেন একজন সুপুরুষ। আল্লাহ্ ছাড়া পৃথিবীর কোনো কিছুতেই ভয়-ভীতি-শূন্য একজন মানুষ। সমস্ত জীবন জামাতের সাথে নামাজ আদায় করেছেন।
এশার নামাজ শেষে খাওয়া-দাওয়া করে ৮০ কদম হেঁটে রাত আটটায় শুয়ে পড়তেন। জেগে উঠতেন শেষ রাতে। অর্থাৎ রাত তিনটায়। অযু করে ওয়াজিফা নিয়ে জায়নামাজে আমলে মগ্ন হয়ে যেতেন। তাহাজ্জুত নামাজ শেষে ফজরের নামাজ জামাতের সাথে পড়ে আব্বা ও আম্মা অল্প একটু নাস্তা করে আব্বা প্রাতর্ভ্রমণে বের হয়ে পড়তেন। আম্মাও আব্বার অনুকরণ অনুসরণ করতেন। অতীব নিষ্ঠার সাথে ধর্ম পালনে নিয়োজিত থাকতেন।
আব্বা বিধবা, এতিম আত্মীয়স্বজনদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রাখতেন। অনেকের পড়ালেখা করিয়েছেন, নিজ খরচে বহুজনের বিয়ে দিয়েছেন। এতিমদের আর্থিক সাহায্য করেছেন। পাড়া-প্রতিবেশীদের সবরকম খোঁজখবর রেখেছেন, সাহায্য করেছেন। সনাতন ধর্মের লোকদের সাথেও স্বভাব ছিল। সকলেই আব্বাকে ভীষণ ভক্তি ও শ্রদ্ধা করতেন। সনাতন ধর্মের সন্তানদের বিয়ের অনুষ্ঠানে আব্বা নিমন্ত্রিত হতেন ও উপস্থিত থাকতেন। যারা কাজের লোকজন ছিল, তাদের ও তাদের পিতা-মাতা, এদের সন্তানদের সাহায্য করেছেন এবং বিয়ের সমস্ত খরচ বহন করেছেন।
আব্বা মানিকগঞ্জ মহকুমার কাজী ও ম্যারেজ রেজিস্ট্রার হিসেবে ব্রিটিশ আমল থেকে ৪০ বছর কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে মানিকগঞ্জের বড় মসজিদকে বড় করা ও সংস্কারের কাজ করেছেন। দুইটি মাদরাসা ও সেওতায় কবরস্থান প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। প্রতি বৃহস্পতিবার মাগরিবের নামাজ প্রতিবেশীদের নিয়ে জামাতের সাথে আদায় করতেন ও ইমামতি করতেন। নামাজ শেষে দোয়া ও ধর্মীয় আলোচনা করে শেষে সকলকে ক্ষীর খাওয়াতেন। সপ্তাহে ২/৩ বার কুরআন খতম দিতেন। সময় পেলেই পড়তেন।
তিনি একজন ইতিহাসবিদ ছিলেন। অনর্গল ইসলামের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি, তাফসিরের উপর বক্তব্য পেশ করতেন। দেবেন্দ্র কলেজের ইসলামিক ইতিহাসের প্রফেসর তাহের সাহেব ইসলামিক ইতিহাসের উপর আলোচনার জন্য আব্বার সাথে বসে ছিলেন। আলোচনা শেষে আমাকে বলেছিলেন, আপনার পিতা জ্ঞানের সমুদ্র। আব্বা তাবলিগের আমির ছিলেন ও তাবলিগ জামায়াতের সাথে বহু জায়গায় দেশ সফর করেছেন।
আতিথেয়তা আব্বা-আম্মার প্রদান বৈশিষ্ট্য ছিল। মানিকগঞ্জের সকল অফিসিয়ালগণ ও তাদের স্ত্রীরা আব্বার আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন ও আম্মার হাতের অপূর্ব রান্নার স্বাদ উপভোগ করেছেন। একবার মানিকগঞ্জের এসডিও হয়ে আসলেন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে রাজা নামের এক ভদ্রলোক। মেজর ছিলেন এবং পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন প্রতিযোগিতায় পরীক্ষা দিয়ে সিএসপি হয়েছিলেন এবং এসডিও হিসেবে নিয়োগ পেয়ে মানিকগঞ্জে এসেছিলেন। মানিকগঞ্জে এসেই সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে ভোরবেলা আর্মি ট্রেনিং দেওয়া শুরু করলেন। ক্রমশঃ
দেশবার্তা/জেএ