পৃথিবীতে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যার কোনো বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নেই। অথচ সত্য কাহিনি। এমনই কিছু ঘটনার বিন্যাস ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরা হলো:
অলৌকিক
আমার নানুর কণ্ঠ ছিল সুরেলা, মিষ্টি। খুব সুন্দর গজল গাইতেন। জিন তাঁকে তুলে নিয়ে যেত গান শোনার জন্য। নানু শুয়ে আছেন। গভীর রাতে দেখা গেল, তিনি শূন্যে ভাসছেন এবং আস্তে আস্তে উপরে উঠে ঘরের ছোট একটি ছিদ্র দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ভোরে অজ্ঞান অবস্থায় নানুকে উঠানে পাওয়া গেল। জ্ঞান ফিরে আসার পর বিস্তারিত ঘটনা জানালেন যে, তাঁকে উড়িয়ে জিনদের রাজদরবারে নিয়ে যাওয়া হলো।
নানু মাঝখানে, সামনে থালায় নানান ধরনের ফল- বেদানা, আঙ্গুর, পেস্তা বাদাম। রাজসিংহাসনে রাজা বসে আছেন। তিনি খেতে বলায় নানু ভয়ে ভয়ে ওগুলো কিছুটা খেলেন। রাজা খুব ভদ্রভাবে গজল গাইতে বললেন। নানু মিষ্টি সুরে গজল গাইতে লাগলেন। সমস্ত সভাসদ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গান শুনল। নানুকে একটি নতুন গজলের তালিম দেওয়া হলো। এরপর জিনের বাদশা হুকুম দিলেন, ‘ওনাকে রেখে এসো।’ নানু জ্ঞান হারালেন।
১. আরেক দিনের ঘটনা। নানা-নানু নৌকা করে কোনো এক আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছেন। গভীর রাত, চারদিক অন্ধকার, আকাশজুড়ে মেঘ; যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে। নানু ওজু করার জন্য ছইয়ের ভেতর থেকে বের হলেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকালো। সমস্ত আকাশ এবং চারদিক আলোকিত হয়ে গেল। নানু আকাশের দিকে তাকালেন। আবার বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে গেলেন। দেখলেন, সমস্ত আকাশ আলোকিত, আকাশ থেকে একটি সিঁড়ি নেমে এসেছে। সেই সিঁড়িতে পা ফেলে ছন্দময় ভঙ্গিতে এক অপূর্ব সুন্দরী যুবতী হাতে পূজার থালা নিয়ে নেমে আসছে।
হঠাৎ দমকা হাওয়ায় পূজার থালা থেকে একটি বেলপাতা নানুর পায়ের সামনে উড়ে এসে পড়ল। এমন সময় নদী থেকে কালো মিচমিচে একটি লোক নৌকায় উঠে বেলপাতাটি নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিল। নানু জ্ঞান হারালেন।
ভৌতিক
আমার নানা-নানু মানিকগঞ্জে বসবাস করতেন। একবার আমার বড় মামা ও ছোট মামা গভীর রাতে পড়তে পড়তে স্থির করলেন যে, বেউথা নদীর ধারে বেড়াতে যাবেন। দুজনে বেরিয়ে পড়লেন। মানিকগঞ্জে তখন এত ঘনবসতি হয়নি। দূরে দূরে ঘরবাড়ি আর চারদিকে ঘন জঙ্গল। মানিকগঞ্জ মডেল স্কুলের ভেতর দিয়ে সরাসরি বেউথা নদীর দিকে দুই ভাই সেই অন্ধকার রাতে হনহন করে হাঁটা শুরু করলেন।
তারা কাপালি পাড়ার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বেউথা নদীর ধারে এসে পড়লেন। বড় মামা অনেকটা পাগলাটে ধরনের, আর ভয়ডর বলতে তাঁর কিছু নেই। বড় মামা বললেন, “দেখ, প্রকৃতি কেমন কথা বলে।” গরমের দিন, হু হু করে বাতাস আর কুলকুল করে নদী বয়ে চলেছে। আকাশে মেঘ আর চাঁদের লুকোচুরি খেলা। চারদিক নীরব-নিস্তব্ধ।
হঠাৎ করে বললেন, “চল, আমরা হাঁটার পাল্লা দিই। আমি এখান থেকে নাক বরাবর হাঁটা শুরু করব, আর তুই যাবি বান্দুটিয়া দিয়ে।” পাশাপাশি দুটোই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে রাস্তা। এক, দুই, তিন বলে শুরু হলো হাঁটা।
এবার বাসায় ফেরার পালা। সেই গভীর রাতে দুই ভাই ভিন্ন রাস্তায় এগোতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ শোনা গেল ছোট মামার তারস্বরে চিৎকার আর আজানের ধ্বনি। বড় মামা বুঝতে পেরেছেন, ছোট মামার নিশ্চয়ই কোনো বিপদ হয়েছে। তিনি নিজ চলার পথ ত্যাগ করে বন-জঙ্গল ভেঙে বান্দুটিয়ার দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে লাগলেন।
দূর থেকে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখতে পেলেন। একজন বিধবা মহিলা সাদা কাপড় পরা, কপালে বড় চোখ, অট্টহাসি হাসছে। বিরাট বিরাট দাঁত নিয়ে ছোট মামার দিকে এগিয়ে আসছে। আর ছোট মামা ভয়ে কাঁপছেন এবং আজান দিতে দিতে পিছিয়ে আসছেন। ইতিমধ্যে বড় মামা পাশে এসে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই মহিলাটি হঠাৎ করে ছোট পাখি হয়ে উড়ে গেল। বড় মামা ছোট মামাকে ধরাধরি করে বাসায় নিয়ে এলেন। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ভীষণ জ্বর আসল। সকলে জিজ্ঞাসা করল, কী হয়েছে।
ছোট মামা বর্ণনা দিলেন যে, বান্দুটিয়ার রাস্তায় কিছুদূর যাওয়ার পর দেখতে পেলেন সাদা কাপড় পরা একজন বিধবা মহিলা আগে আগে হেঁটে যাচ্ছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “কে যায়?” দু-তিনবার জিজ্ঞাসা করতেই মহিলা ঘুরে দাঁড়াল। কপালে বড় একটি চোখ, হা হা করে অট্টহাসি দিতে দিতে এগিয়ে আসতে লাগল। তাঁর বিরাট দুটি দাঁত। ভয়ে চিৎকার করে আজান দিতে লাগলাম। বড় ভাই পাশে এসে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই মহিলা ছোট পাখি হয়ে উড়ে গেল।”
ছোট মামা এক নাগাড়ে সাত দিন জ্বরে ভুগে মারা গেলেন।
আধ্যাত্মিক
২১০ বছর পূর্বের কথা। আজিমপুর এলাকা তখন শুধু জঙ্গলে পরিপূর্ণ। এখানে কোনো লোকবসতি ছিল না। বাঘ, সাপ, জীবজন্তুর বাস ছিল। এখানে এসে বসবাস শুরু করেন একজন কামেল ফকির, যিনি সাধনা করে আধ্যাত্মিক জগতের শীর্ষ মার্গে আরোহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন সৈয়দ শাহ দায়েম উল্লাহ (র.)।
তাঁর বসবাসের কারণে আস্তে আস্তে এই বিরান জায়গায় বসতি স্থাপন হয়। ইনি বিরান এলাকায় দায়রা বন্ধ হয়ে থাকেন। (অর্থাৎ, বসবাসের এই এলাকার বাইরে তিনি যাবেন না। তাই এলাকার নামকরণ হয় আজিমপুর দায়রা শরিফ। হুজুরের থাকার জন্য ও শিষ্য-সাবকদের নিয়ে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকার জন্য নির্দিষ্ট স্থান, পাশে মসজিদের স্থাপনা গড়ে ওঠে।) মসজিদের পাশে দেয়াল দিয়ে ঘেরা হয়।
চারদিক থেকে লোকে লোকারণ্য হতে লাগল এবং দায়েম (র.)-এর সংস্পর্শে সকলেই উপকৃত হতে লাগল। এক অলোকবর্তিকা চারদিকে ছড়িয়ে গেল। এক নতুন সভ্যতা গড়ে উঠল।
এই দায়রা শরিফের পাশেই পশ্চিম ধারে এক সাধুবাবার আস্তানা ছিল। জায়গাটির নাম ছিল “রামবাগ”। এই সাধু প্রায় সময় তাঁর সাধনার শক্তি প্রদর্শনের জন্য বাঘের পিঠে চড়ে দায়রা শরিফের আশপাশে ঘুরে বেড়াতেন।
দায়েম (র.) মসজিদে যাওয়ার সময় বিষয়টি লক্ষ্য করতেন, কিছু বলতেন না। শিষ্য-সাবকগণ বলতেন, “হুজুর, সাধু আপনাকে ও আমাদের দেখাবার জন্য এভাবে বাঘের পিঠে ঘুরে বেড়ায়।” হুজুর এটাকে আমলে নিতেন না।
শিষ্য-সাবকগণ পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন, “হুজুর, একটা কিছু কেরামত প্রদর্শন করুন।”
হুজুর একদিন সকালে ফজরের নামাজ শেষে দেখলেন, সাধু বাঘের পিঠে চড়ে দায়রা শরিফের প্রবেশপথে। হুজুর চক্ষু মুদলেন, ধ্যানে মগ্ন হলেন। এরপর চোখ খুলেই দেয়ালে চড়ে বসে বললেন, “আল্লাহর হুকুমে হাঁট।” দেয়াল চলতে শুরু করল এবং সাধুর উপরে এসে পড়ল। বাঘ সাধুকে ফেলে জঙ্গলে পালিয়ে গেল। আর সাধু হুজুরের পা ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলেন। এরপর সাধু দায়েম রহমতুল্লাহি আলাইহির ভক্ত হয়ে গেলেন।
দেশবার্তা/কেএ/একে