সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে তখন সোহরাব সাহেব আসরের নামাজ পড়ে। মাথায় ক্যাপ, প্যান্ট, শার্ট, পরে হাতে ছড়ি নিয়ে ধানমন্ডি লেকের দিকে বৈকালিক ভ্রমণে বের হলেন। তিনি এক সময় বিদেশি কোম্পানিতে চাকুরিরত ছিলেন। অনেক বছর ধরে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। হঠাৎ করে স্ত্রী বিয়োগে তাকে ভীষণ একাকিত্ব পেয়ে বসেছে। বয়স ৭০ বৎসর কিন্তু এখনও শক্ত সমর্থ ও সুন্দর। তাঁর চলনে বলনে অভিজাত্যের ছাপ রয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে ডিঙ্গি যে জায়গাটি, সেখানে লেকের পাড় দিয়ে বেশ জোরে হাঁটছেন। লেকের পাড়ে অনেক তরুণ তরুণী বসে বসে গল্প করছে আর চিনা বাদাম খাচ্ছে। সব বয়সের লোকজন হাঁটছে। পড়ন্ত বেলা সূর্যের কোনো তাপ নেই, ঝিরঝিরে হাওয়া। পরিচিত দু,একজন বয়স্ক লোকের সাথে দেখা হলো। হাই হ্যালো বলে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলেন। সমবয়সী বন্ধু বান্ধব অনেক পৃথিবী ছেড়ে চেল গেছেন। অনেকক্ষণ হেঁটে এবার তিনি নিরালা জায়গা খুঁজছেন যেখানে কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নেবেন। সূর্যটা লাল আভা ছড়িয়ে টুপ করে ডুবে গেল। চারদিকে অন্ধকার নেমে এলো। আলোর ব্যবস্থা থাকায় ঘুটঘুটে অন্ধকার না হয়ে ধানমন্ডি লেক তখন নিভু নিভু আলোতে আলোকিত।
হঠাৎ করে বসার জায়গা মিলে গেলো। সিমেন্টের তৈরি লেকের পাড় ঘেঁষে দুধারে বসার সুন্দর জায়গা। দেখলেন লোকজন নেই। পূর্ব দিকের ধারটায় বসে গেলেন। ডাইবেটিক আছে, বিস্কুট পানি সাথেই রাখেন। বেশ আয়েশ করে বিস্কুট, পানি বের করলেন। বিস্কুটে কামড় দেয়ার মুহূর্তে হঠাৎ একজন মহিলা কণ্ঠ “আপনি কি রোজই বেড়াতে আসেন এখানে ? সোহরাব সাহেব হকচকিয়ে সামনের দিকে চাইলেন। জায়গাটা অন্ধকার থাকায় চোখের দৃষ্টিও কমে যাওয়ায় একজন মহিলা বসা বুঝতে পারেননি। কী উত্তর দেবেন তিনি, অপলক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইলেন। এবার তিনি চশমাটি পরে ভাল করে অবলোকন করলেন। স্পষ্ট দেখতে পেলেন সুন্দরী একজন মহিলা। বয়স আনুমানিক ৪৫-৫০ এর মাঝামাঝি হবে। যৌবন চলে গেলেও যেন এর রেশ টুকুন ধরে রেখেছেন। মহিলা হেসে আবার একই প্রশ্ন করলেন। সোহরাব সাহেবের সম্বিত ফিরে এলো। তিনি বললেন, হাঁটতে আসি প্রতিদিন কিন্তু এক জায়গায় বসি না। সুরেলা কণ্ঠে মহিলা কথা বাড়িয়ে চললেন। “এই একই জায়গায় আমি আজ পাঁচ বছর ধরে একাকী এসে বসি। এই জায়গাটা অনেক স্মৃতি বিজড়িত। ‘বিজয় আমার স্বামী, ওর এই জায়গাটা, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আমরা একসঙ্গে পড়তাম বহুবার এখানে বসে আড্ডা দিয়েছি। এরপর বিয়ে হলো। সুখেই দিন কাটছিল। হঠাৎ করেই হার্টফেল করে বিজয় আমায় ছেড়ে চলে গেল। সেই থেকে বার বার আমি এখানে ফিরে আসি।”
মি. সোহরাব এবার দুঃখ প্রকাশ করে বললেন, “জীবনটা এমনই চলতে চলতে ছন্দপতন হয়। কিছু কথা, কিছু দুঃখ, কিছু সুখ স্মৃতি জীবন ভর বয়ে বেড়াতে হয়। এমনি করেই জীবনাবসন হয়।” সোহরাব সাহেব উসখুস করতে লাগলেন। ওঠার জন্য।
মহিলা নিজ থেকেই বললেন, রাত হয়ে যাচ্ছে, ফিরতে হবে। বললেন, আগামীকাল সন্ধ্যায় দেখা হচ্ছে। বলেই দাঁড়ালেন। নামটা জানা হলো না। বলেই উনার নামটি উচ্চরণ করলেন। আমার নাম সন্ধ্যা। উভয়ে উঠে দাঁড়ালেন। রাস্তায় উঠে সোহরাব সাহেব বাঁ দিকে চলে গেলেন উনার বাসার দিকে, মিসেস সন্ধ্যা উল্টো রাস্তায় পা বাড়ালেন।
মি. সোহরাব বাড়ির কাছাকাছি আসতেই শুনতে পেলেন বিয়াই এর গলার আওয়াজ তার বড় মেয়ের শ্বশুর। তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকেই বলে উঠলেন, “বিয়াই সাহেব কখন এলেন? সোহরাব সাহেব বললেন, বৈকালিক ভ্রমণে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। এবার বিয়াই আজিজ সাহেব বললেন, বয়স হয়েছে। তার নানান সমস্যা, খুঁতখুঁতে স্বাভাবের অসুখ আলোচনার বিষয় বস্তু। শুরু করলেন। আপনি তো সারাদিন নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান......
মি. সোহরাব বললেন, আর বলবেন না আমার একটা বাতিক আছে। কারো কোনো অসুখের কথাশুনলে তার কাছে ছুটে যাই কিছু হোমিও কিছু হার্বাল চিকিৎসা নেই। অনেক সময় গাইটের পয়সাও খরচ হয়। কখনও বা তদবির চায়। সমস্যা দূরও হয়ে যায়। আরেকটি মজার ব্যাপার। “একটি খেলা” প্রানচেট এটারও প্রয়োগ করি মাঝে মাঝে। অনেক ব্যাপার সঠিক হয়ে যায়। এটা হয়তো টেলিপ্যাথি হতে পারে। কেউ কেউ বলে ঝড়ে বক মরে ফকিরের কেরামতি বাড়ে। ব্যাপার কী আমি নিজেও জানি না। বিয়াই আজিজ সাহেব বিস্মিত নয়নে সব শুনছিলেন। জানালেন তাঁর কিছু ভাল লাগে না। সব কিছুতেই বিরক্ত লাগে। দুর্বলতা কাটছে না।
মি. সোহরাব উপদেশ দিতে লাগলেন এত ঔষধ খাওয়া ছেড়ে দিন। হার্বাল শুরু করুন। আনন্দে থাকুন। ইয়োগা ও মেডিটেশন করুন, যে কোন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকুন। নাস্তা এসে গেল। বিয়াই আজিজ সাহেব ডাইবেটিক রোগী প্রথমেই মিষ্টি গলধকরণ করলেন আর বলতে লাগলেন অল্প মিষ্টি খেলে কিছু হবে না। আপনিও খান। এ ব্যাপারে মি. সোহরাব খুবই অনড়, ইনিও ডাইবেটিকের রোগী কিন্তু কিছুতেই মিষ্টি স্পর্শ করেন না। এবার সোহরাব সাহেব বললেন, বিয়াইন কেমন আছেন। এই মহিলার কথা বলবেন না। "সারা দিন-রাত শুধু দু'আ কালাম নিয়ে ব্যস্ত।
অনেক গল্পই হলো কিন্তু মি. সোহরাব সাহেব আজকের ঘটনাটি দিব্বি চেপে গেলেন। আজিজ সাহেব বিদায় নিলেন। বিয়াই সাহেবকে বিদায় দিয়ে সোহরাব মিয়া নিজ ঘরের দিকে অগ্রসর হলেন। রাত ৯টার মত হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকে দেখলেন টেবিলে রুটি তরকারি দেওয়া আছে। রাত বেশ হয়েছে, চারদিকে নিঝুম। শুধু নাতিরা শিক্ষিকার কাছে পড়ছে। ঘরের দরজা বন্ধ। তাই দুজনের হুল্লোড় বন্ধ। দাদা দাদা বলে কেউ ছুটে এলো না। তিনি দুবার ছেলেকে ডাকলেন। কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসলেন। মনটা বিষিয়ে পেল রুটি ঠাণ্ডা, শক্ত, তাই চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে খেতে ঠিক করলেন লজ্জা শরম বাদ দিয়ে আগামী কাল ছেলেকে বলতে হবে।
মিসেস সন্ধ্যার বাসায় ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। কলিং বেল টিপলেন একটু দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে। কাজের মেয়েটি চোখ ডোলতে ডোলতে বেশ বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে সরে দাঁড়ালো। তিনি সরাসরি নিজের শোয়ার ঘরে যেতে যেতে শুনতে পেলেন বৌমা ছেলেকে বলছে, “ওই দেখ তোমার মা এতক্ষণে আসলো। তাড়াতাড়ি ফিরলে বাচ্চাদের রেখে ঘুরে আসতাম।” ছেলে রফিক অফিস থেকে ফিরেছে, ও বলল, চুপ থাক মা শুনতে পাবেন।” “শুনুক” সন্ধ্যা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সবই শুনলেন। মনটা খারাপ হয়ে গেল। অনেক ফুরফুরে মন নিয়ে ঘরে ফিরেছেন।
তিনি কাজের বুয়াকে ডাকলেন পাকের খোঁজ খবর নিলেন। শুনলেন সকলেই খেয়েছে শুধু ওনার নাতি কামাল খায় নি, দাদির জন্য বসে আছে। সন্ধ্যা তাড়াতাড়ি হাত মুখ খাওয়ার টেবিলে বসে ডাকতে লাগলেন, কামাল দাদু আমার সাথে খেতে এসো। কামাল দৌড়ে এসে দাদিকে জাপটিয়ে ঘরে নাতিকে নিয়ে শুয়ে পড়লেন। ঘুম তো আর আসছে না। কখন ঘুমিয়ে গেলেন। রাতে স্বাপ্ন দেখলেন “বিজয়কে”। বিজয় বলছে, বহুদিন লেক পারে যাওয়া হচ্ছে না। চলো বেড়িয়ে আসি। সন্ধ্যা আবেগে বিজয়ের হাত চেপে ধরলেন। ভোরে ঘুম ভেঙে গেল। মনটা উদাস হয়ে গেল ।
রাত্রিটি পার হয়ে ভোর হয়ে গেল। আরেকটি নতুন দিনে সমাগম। মি. সোহরাব প্রাতঃ ভ্রমণ সেরে তাড়াতাড়ি নাস্তা খেয়ে দুই নাতিকে স্কুলে ছাড়তে গেলেন। ভাবতে লাগলেন বিকালটা যেন অন্য কাজে আটকিয়ে না পড়েন। ফিরে এসে পেপার নিয়ে বসলেন। আর জাগজিত সিং-এর গজল শুনতে লাগলেন। সময় পড়িয়ে চললো। বারে বারে ঘড়ি দেখছেন। দুপুরে খেয়ে গড়িয়ে নিলেন। অবসরের পর হাঁটতে বের হলেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার প্রাক্কালে সোহরাব সাহেব ধানমন্ডি পার্কে ঢুকে পড়লেন। সন্ধ্যা বেলার সূর্যটা লাল আভা ছড়িয়ে ডুবু ডুবু প্রায়। সোহরাব সাহেব হাঁটতে হাঁটতে কেমন যেন আনমনা হয়ে যাচ্ছেন। সন্ধ্যার আলো আঁধারের বুক চিরে গতকালের জায়গাটিতে সোহরাব সাহেব চুপ করে বসে পড়লেন। এমন সময় সন্ধ্যার খিল খিল করে হাসির দমকে হকচকিয়ে গেলেন। জিজ্ঞাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠলেন, আরে আপনি। সারাদিনের কর্মক্লান্ত সন্ধ্যা বললো, আমি এই পড়ন্ত বেলায় এখানে এসে সূর্য ডোবার শেষ দৃশ্যটি মন পাণ দিয়ে উপভোগ করি। সোহরাব সাহেবও উৎসাহের সাথে একই উপলব্ধি ব্যক্ত করলেন। একজন আরেকজন সুখ দুঃখের কথা, অনেক স্মৃতি রোমন্থন করলেন। দুজনেই অনেক হালকা হলেন। সন্ধ্যা এক সময় একটু ইতস্তত করে বললেন, আমি সেকারিন দিয়ে ক্ষীর রেঁধে এনেছি খাবেন? সোহরাব সাহেব খুব আনন্দচিত্তে ক্ষীর খেতে চাইলেন। বললেন, বাসায় সকলেই বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি খায়। মেহমান আসে কিন্তু মিষ্টি খেতে পারি না ডাইবেটিকের কারণে। আপনি যে আমার কথা ভেবে মিষ্টি নিয়ে এসেছেন আমি যারপর নাই আনন্দিত। খুব তৃপ্তি ভরে উনি ক্ষীর খেলেন।
এভাবে সোহরাব সাহেব ও সন্ধ্যা প্রতিদিন ঠিক সন্ধ্যায় মিলিত হতে লাগলেন। তাদের একাকিত্ব ঘুচে গেল। সম্বোধন আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসলো। সোহরাব সাহেব গল্পগুচ্ছ একদিন বললেন, জীবন তো একদিন শেষ হয়ে যাবে। সন্ধ্যা আঁতকে উঠল বললো, এমন কথা আর বলবে না। সোহরাব সাহেব প্যান্টের পকেট থেকে একটি কাগজ বের করে বললেন, আমি একটা কবিতা লিখেছি। সন্ধ্যা অতি আগ্রহ নড়ে চড়ে বসলো। সোহরাব সাহেব পড়তে শুরু করলেন। শিরোনাম “অস্তগামী সূর্যের সাথে চাঁদের দেখা হলো"।
“বেলা শেষ সূর্য তখন ডুবু ডুবু এ যেন জীবন অবসানের শেষ পর্ব। না সূর্যের অন্ত যাওয়া হলো না। হঠাৎ করে চাঁদের সাথে সূর্যের দেখা হয়ে গেলো। চাঁদ বললো, তুমি অস্তগামী হইও না আমার সান্নিধ্যে থাক। সূর্যের অস্ত যাওয়া হলো না। গোধূলী লগ্নের লাল আভা ছাড়িয়ে চাঁদের সাথেই গাঁট ছড়া বাঁধা হয়ে গেল।” দুজনেই কেমন চুপচাপ থাকলো। সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ হলো। চারিদিকে কখন অন্ধকার নেমে এসেছে। সোরাব বললো, এবার ওঠা যাক। উঠতে উঠতে সন্ধ্যাকে জানানো হলো- আগামীকাল সোহরাব সাহেবের নাতির জন্মদিন। জন্মদিনের কেক সন্ধ্যাকে খাওয়ানো হবে। দুজনেই নিজ নিজ বাড়িতে রওয়ানা হলো।
পরদিন সন্ধ্যা তার বাড়ি ঘরের কাজ সেরে নাতিকে স্কুলে নামিয়ে তার অফিসে (মানবাধিকার) চলে গেল এবং ব্যস্ত সময় কাটলো। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সোহরাব সাহেবের কথা মনে পড়তে লাগলো। বিকালের পরেই বের হলো। সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে লোকের সেই চির চেনা স্মৃতি বিজড়িত জায়গাটিতে অবস্থান নিয়ে অধীর আগ্রহে সোরাব সাহেবের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো আর পড়ন্ত বেলার দিকে তাকাতে লাগলো।
এমন সময় হঠাৎ করেই একটি ফোন। সন্ধ্যা তাকিয়ে দেখলো সোহরাব সাহেবের নাম। সন্ধ্যা মোবাইল কানে ধরেই বললো 'সোহরাব'। অন্য প্রান্ত হতে কান্না বিজড়িত কণ্ঠে একটি ছেলের গলা “আমি সোহরাব সাহেবের ছেলে বলছি। আমার আব্বা আর নেই।" সন্ধ্যা চিৎকার করে উঠলো কী-হাত থেকে মোবাইল পড়ে গেল, মাথাটা ঘুরে গেল। অজান্তে পশ্চিম দিকে তাকিয়ে দেখলো সূর্যটা টুপ করে ডুবে গেল।