জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের দ্রোহ, প্রেম ও চেতনার দ্যুতি ছড়িয়ে দিতে দেশজুড়ে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় উদযাপিত হচ্ছে ‘নজরুল বর্ষ’। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সমবেত সুরে উচ্চারিত হচ্ছে নজরুলের শুদ্ধ বাণী। অথচ এই আয়োজনের আবহেই পঞ্চগড়ের সীমান্তঘেঁষা তেঁতুলিয়ায় আড়ালে পড়ে রয়েছেন পদকপ্রাপ্ত নজরুলশিল্পী, সুরকার ও সংগীত সংগঠক তজিরুল ইসলাম।
স্বীয় মেধা, সাধনা ও নিবেদনের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার নাম উজ্জ্বল করা এই শিল্পীকে স্থানীয় প্রশাসনের আয়োজনে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত না করায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সুধীজন ও সংস্কৃতিমনা মানুষ।
জীবনসংগ্রাম থেকে শুদ্ধ সুরের আরাধনা
মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ে তেঁতুলিয়ার প্রত্যন্ত জনপদে জন্ম নেওয়া তজিরুল ইসলামের শৈশব কেটেছে যুদ্ধপরবর্তী সংকট ও নানা সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যে। সেই কঠিন সময়েও তিনি সংগীতচর্চা অব্যাহত রাখেন। সংগীতকে শুধু পেশা নয়, জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়ে জাতীয় কবির শুদ্ধ সুর প্রচার ও প্রসারে নিজেকে নিবেদিত করেন।
নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে উচ্চতর বিশেষ ডিপ্লোমা অর্জনের সময় সুধীন দাস, সোহরাব হোসেন ও খালিদ হোসেনের মতো শাস্ত্রীয় সংগীতের বিশেষজ্ঞদের সান্নিধ্য তাঁর সংগীতচর্চাকে সমৃদ্ধ করে।
বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী তজিরুল ইসলাম বাংলাদেশ নজরুল সংগীত শিল্পী পরিষদের জাতীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
স্বীকৃতি ও অর্জন
দীর্ঘদিনের সংগীতচর্চায় তজিরুল ইসলামের ঝুলিতে জমা হয়েছে একাধিক সম্মাননা ও স্বীকৃতি। এর মধ্যে রয়েছে শুদ্ধ সংগীত চর্চা পদক, শুদ্ধ নজরুল সংগীত প্রশিক্ষণ পদক এবং বাংলাদেশ সংস্কৃতি পরিষদ সম্মাননা। তিনি পেয়েছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত অভিনেতা খলিলুল্লাহ স্মৃতি পদকও।
তেঁতুলিয়া সংগীত বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবেও তিনি বাংলাদেশ ধ্রুব পরিষদ থেকে একাধিকবার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও শ্রেষ্ঠ অধ্যক্ষের সম্মান পেয়েছেন।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রকল্পে জাতিসংঘের অর্থায়নে প্রকাশিত অডিও ক্যাসেটে গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও তিনি যৌথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অর্জন করেন।
শিক্ষকতার পাশাপাশি সংগীতচর্চা
শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে দীর্ঘ ১৪ বছর সংগীতের আলো ছড়িয়েছেন তজিরুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি উত্তরা কে.সি. মডেল কলেজে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।
২০২৪ সালে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে তাঁর একক সুরারোপে আয়োজিত মৌলিক সংগীত সন্ধ্যা ‘সুরে সুরে মন পবন’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ঢাকা ও কলকাতার প্রখ্যাত শিল্পীরা অংশ নেন।
এ ছাড়া করোনা-পরবর্তী সময়ে পঞ্চগড়ে ‘আদি-সুরে নজরুল সংগীত চর্চা’ কর্মশালার আয়োজন করে স্থানীয় তরুণদের মধ্যে শুদ্ধ নজরুল সংগীতচর্চার আগ্রহ তৈরিতে ভূমিকা রাখেন তিনি।
জন্মমাটিতেই আড়ালে
গবেষক, শিক্ষক ও বহুমুখী পদকপ্রাপ্ত শিল্পী হিসেবে পরিচিত তজিরুল ইসলাম দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে পঞ্চগড়ের প্রান্তিক জনপদের সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরেছেন। অথচ নজরুল বর্ষের সরকারি আয়োজনেও তাঁকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ সংস্কৃতিপ্রেমীদের।
তাদের মতে, প্রশাসনিক দূরদর্শিতার অভাব ও আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার কারণে নিজ জন্মভূমিতেই একজন নিবেদিত নজরুলসাধক আড়ালে পড়ে যাচ্ছেন।
সংস্কৃতিমনস্ক নাগরিকদের প্রত্যাশা, জাতীয় কবির অমর বাণী যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। তাঁর প্রকৃত সাধকদের কণ্ঠে সেই বাণী আরও ছড়িয়ে দিতে নজরুল বর্ষের রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় সব আয়োজনে শিল্পী তজিরুল ইসলামের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তজিরুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, দীর্ঘ চার দশকের সঙ্গীত জীবনে এক সময় দীর্ঘ ৭ বছর দিনাজপুর থেকে ১৩৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে তেতুলিয়ায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করে গান শিখিয়েছি এবং ঢাকায় এসেও জাতীয় পর্যায়ের নজরুল সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছি। তবুও 'নজরুল বর্ষে' স্থানীয় প্রশাসন বা নেতৃত্ব আমার এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় এবং মূল্যায়ন না করায় আমি ব্যথিত। একা গিয়ে প্রচার করা সম্ভব নয়, আমি শুধু আমার আজীবনের অর্জিত নজরুল চর্চাকে নিজ এলাকায় ছড়িয়ে দিতে চাই।
প্রতিনিধি/আরএইচ