ভোররাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই কার্যত থমকে যায় রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। রোববার সকাল থেকে টানা বৃষ্টি ও কোথাও কোথাও বজ্রসহ বৃষ্টিতে সড়কে তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। এর সঙ্গে যোগ হয় তীব্র যানজট। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও জরুরি কাজে বের হওয়া সাধারণ মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় রাস্তায় আটকে থাকতে হয়। গণপরিবহনের অপেক্ষায় বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায় যাত্রীদের দীর্ঘ সারি। সময়মতো অফিসে পৌঁছাতে অনেকে বাধ্য হন অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ভাড়ার গাড়িতে উঠতে।
রোববার শেষ রাত থেকেই ঢাকার আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। ভোর হওয়ার আগেই শুরু হয় বৃষ্টি। কোথাও কোথাও ঝোড়ো হাওয়ার পাশাপাশি বজ্রপাতের শব্দও শোনা যায়। বৃষ্টির পানি জমে যাওয়ায় বিভিন্ন সড়কে যানবাহনের গতি কমে যায়। এতে সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানজটও তীব্র হতে থাকে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সংযোগ সড়কে দীর্ঘ সময় ধরে ধীরগতিতে চলতে দেখা যায় যানবাহন।
অফিসগামী যাত্রীদের বড় অংশের অভিযোগ, বৃষ্টির সময় গণপরিবহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় অপেক্ষার সময় বেড়ে যায়। কোনো কোনো বাসস্ট্যান্ডে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়েও বাস পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় অনেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা ভাড়ার গাড়ির দিকে ঝুঁকেছেন। তবে বৃষ্টির কারণে এসব পরিবহনের ভাড়াও বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। ফলে একদিকে সময়ের চাপ, অন্যদিকে বাড়তি খরচ—দুই দিক থেকেই দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে কর্মজীবীদের।
শুধু কর্মজীবী মানুষ নয়, বৃষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। সকালে ছাতা হাতে কিংবা রেইনকোট পরে অনেক শিক্ষার্থীকে সড়কে চলাচল করতে দেখা যায়। কোথাও জমে থাকা পানির কারণে হাঁটাচলায় সমস্যা হয়। আবার যানজটের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় লেগেছে। অভিভাবকদের অনেককেই সন্তানদের নিয়ে বাড়তি বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার চিত্রও দেখা গেছে। অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমে যাওয়ায় পথচারীদের চলাচল ব্যাহত হয়। এর আগে চলতি মাসেও সামান্য বৃষ্টির পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলজট ও যানজটের কারণে ব্যাপক ভোগান্তির খবর পাওয়া গেছে।
বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে রাজধানীর কাঁচাবাজারেও। সকাল থেকে বিভিন্ন বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল। বৃষ্টির কারণে অনেকে প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হননি। তবে বাজারে ক্রেতা কম থাকলেও কিছু সবজির দাম বাড়তি ছিল বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। তাদের ভাষ্য, বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকা থেকে সবজিবাহী যান সময়মতো রাজধানীর বাজারে পৌঁছাতে পারেনি। এতে সরবরাহে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় বাড়ার প্রভাবও পড়েছে খুচরা দামে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই যদি সবজি সরবরাহে এমন বিঘ্ন ঘটে, তাহলে টানা বৃষ্টি হলে বাজারে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য আসে, সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে পাইকারি ও খুচরা বাজারে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। রোববার সকাল থেকে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার আকাশ আংশিক মেঘলা থেকে মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে। এ সময় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।
শুধু আজ নয়, আগামী কয়েক দিনও বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচ দিনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার ঢাকা বিভাগের দু-এক জায়গায় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। মঙ্গলবার ঢাকা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বুধবার ও বৃহস্পতিবারও ঢাকা বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণও হতে পারে। বর্ধিত পাঁচ দিনে দেশে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আবহাওয়ার এই পরিস্থিতির পেছনে উত্তর আন্দামান সাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সৃষ্টি হওয়া একটি লঘুচাপের প্রভাব রয়েছে। একই সঙ্গে মৌসুমি বায়ুর একটি বর্ধিতাংশ বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।
ফলে আগামী কয়েক দিন রাজধানীবাসীর জন্য বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও যানজটের ভোগান্তি এড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কর্মজীবী ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি নিত্যপণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।
দেশবার্তা/এমআর