দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অস্ত্রের ঝনঝনানি

ইসমাঈল হুসাইন ইমু

জাতীয়

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। তবে পরিস্থিতি সহসাই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে

2026-10-11T18:04:45+06:00
2026-10-11T18:04:45+06:00
সোমবার ● ১২ অক্টোবর ২০২৬,
২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
 ইপেপার   আর্কাইভ   ভিডিও 
চলমান বার্তা:
জাতীয়
খুলনায় খুন-জখম নিত্যদিনের ঘটনা
দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অস্ত্রের ঝনঝনানি
নিরাপত্তাহীনতায় খোদ পুলিশ
ইসমাঈল হুসাইন ইমু
প্রকাশ: রোববার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৪ পিএম 
⏲
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। তবে পরিস্থিতি সহসাই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অস্ত্রের ঝনঝনানিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস বাড়ছে। আতঙ্কগ্রস্ত খোদ পুলিশও। প্রায় প্রতিদিনই নগরীর কোথাও না কোথাও খুন-জখমের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে খুলনায় পুলিশ সদস্যদের রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা খুবই উদ্বেগজনক। 

অন্যদিকে, অপরাধী গ্রেপ্তার করতে গিয়েও পুলিশকে হেনস্তা বা বদলির শিকার হতে হচ্ছে। এতে পুলিশের মনোবল আরও দুর্বল হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পুলিশের রদবদল ও চাকরিচ্যুতির ঘটনায় বাহিনীর সদস্যরা আগের মতো পুলিশিং করতে পারছেন না।

সম্প্রতি খুলনার রূপসা উপজেলায় ৬০ বছর বয়সী আক্তার ঢালীকে নিজ বাড়ির সামনে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি মারা যান। এর মাত্র দেড় মাস আগে তাঁর ছেলে জয় ঢালীও দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হন। খুলনার দিঘলিয়ায় নাসিমুল করিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গুলিতে আহত হন খুলনার লবণচরা থানা বিএনপির নেতা মো. ইকবাল শেখ। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য বলছে, সারা দেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ১৩৮টি গুলির ঘটনায় ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রামসহ ২১ জেলায় গুলিতে প্রাণ গেছে ৬৭ জনের। আহত হয়েছেন অন্তত ১৪৫ জন। এর মধ্যে খুলনায় ১৫ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। চট্টগ্রামে নিহত হয়েছেন ১৩ জন। 

ডিএমপি সূত্র বলছে, গত নয় মাসে রাজধানীতে ১৭টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ছয়জন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে সর্বাধিক ৩৯টি ঘটনা ঘটেছে খুলনায়। সর্বশেষ গত রোববার খুলনায় দুটি গুলির ঘটনার কয়েক দিন আগে আরও দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুর্বৃত্তদের হাতে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মজুত বাড়তে থাকে। এ সময় থানা ও ফাঁড়ি থেকে পুলিশের লুট হওয়া পাঁচ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের বেশির ভাগ সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যায়। এর মধ্যে ১৩ শতাধিক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এর বাইরে সীমান্তের চোরাই পথে প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র দেশে ঢোকে। এসব অস্ত্রের কারণে এখন খুনাখুনি বাড়ছে। 

অপরাধ বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই সরকারের বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ রয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে সব অর্জন বৃথা যেতে পারে।

এদিকে, সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে খুলনায় রাতের বেলা পুলিশ সদস্যদের একা চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে জেলা পুলিশ প্রশাসন। খুলনা জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) পুলিশ সুপারের স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক চিঠিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনায় বিশেষ অভিযানসহ অন্যান্য দায়িত্ব পালনের সময় সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ইউনিট ইনচার্জদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় জেলার রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা থানা এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটায় সদস্যদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাতে কোনোভাবেই যেন সদস্যরা একা চলাচল না করেন, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রূপসা থানায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা শেষে ফেরার পথে সাদা পোশাকে থাকা এক পুলিশ পরিদর্শক ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হন। ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরই মূলত জেলা পুলিশের প্রতিটি সদস্যের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রাতের বেলায় একা চলাচলের ওপর এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

অপরদিকে, পুলিশের বিভিন্ন পদে ব্যাপক রদবদল ও বদলি করা হচ্ছে। প্রায় ২০০ কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছে বাধ্যতামূলক অবসরে। বদলি, রদবদল ও অবসরকে বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রয়াস হিসেবে দেখা হলেও সদস্যদের মধ্যে অস্বস্তি ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাটানোই পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

অবশ্য পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির জানান, এই বদলি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক শাস্তি নয়; বরং এটি পেশাদারত্ব ফিরিয়ে আনার নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণকে সেবা প্রদানে গতিশীলতা আনা এর লক্ষ্য। 

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মাঠপর্যায়ে পুলিশের উপস্থিতি জোরদার ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সমন্বয় বাড়াতে অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব প্রদান নিশ্চিত করা হচ্ছে। পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে থানা ও মাঠপর্যায়ে ব্যাপক রদবদল ও বদলির সিদ্ধান্ত প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে পুলিশ। সরকার পতনের পর পুলিশকে কাজে ফেরানো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। শুরু হয় পুলিশে বড় ধরনের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস। অতীত সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের সরানো হয়। 

অন্যদিকে, নতুন করে পদায়ন ও পদোন্নতি দিয়ে ঢেলে সাজানো হয় এই বাহিনীকে। এই প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।

এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। বিশেষ করে মহানগর পুলিশ, গোয়েন্দা ইউনিট, শিল্পাঞ্চল পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিভিন্ন রেঞ্জ এবং জেলা পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেতে নানা তৎপরতা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। কিছু কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারস্থও হচ্ছেন।

এছাড়া গত দুই বছরে পুলিশে একের পর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে অতীতের বিতর্কিত নির্বাচন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন কিংবা আলোচিত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ কারণে বাহিনীর একটি অংশের মধ্যে চাকরি হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যাঁদের চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তাঁদের অনেকেই এখন অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় গত দুই বছরে অন্তত ১৯৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আরও অন্তত ৩০ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর কথা শোনা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ৫৭ জন কর্মকর্তাকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে।

সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা বলেন, ব্যক্তিগত গ্রুপিং বা বিভক্তি দীর্ঘস্থায়ী হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে পেশাদারত্ব। বাহিনীর ভেতরে প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি একে অপরকে হেয় করা, অপপ্রচার কিংবা প্রশাসনিক অস্থিরতায় রূপ নেয়, তাহলে সেটি পুরো প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতিকর। অপপ্রচার যাঁরা করছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য বাহিনীর মনোবল দুর্বল করার অপচেষ্টা কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশে নেতৃত্ব, আস্থা এবং পেশাদার সংস্কৃতির সংকটও দূর করতে হবে। পুলিশ যদি নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কাটিয়ে উঠতে না পারে, তাহলে শুধু বাহিনীর মনোবল নয়, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

দেশবার্তা/আইএইচই/একে


সর্বশেষ সংবাদ 

১৫ বছর পর আসছে ‘দ্য ডার্টি পিকচার ২’
এই বিক্ষোভ থামবে না, লড়াই সবে শুরু: সিজেপি
দুর্গাপূজায় চলবে তিন জোড়া বিশেষ ট্রেন
‎​কুড়িগ্রামে ফ্রেন্ডশিপের উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মাঝে ভেড়া বিতরণ
আধিপত্যবাদের হাত থেকে দেশ রক্ষা করতে বিএনপির বিকল্প নেই

সর্বাধিক পঠিত 

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালন উপলক্ষে ‌‌'বিআরটিএ' সভা অনুষ্ঠিত
কমিউনিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৮১তম সভা
চান্দিনায় বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মতবিনিময় সভা
মোরেলগঞ্জে প্রধান শিক্ষকের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
বন রক্ষকই যখন ভক্ষক: সিসিএফের বিরুদ্ধে অনিয়মের পাহাড়
জাতীয়- এর আরো খবর 
সম্পাদক ও প্রকাশক: কাজী তোফায়েল আহমদ।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক অফিস: গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম একে খন্দকার সড়ক, মহাখলী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১২।
www.thedailydeshbarta.com
Mobile: 01816-185722, Email: [email protected]
Advertisement