বন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, বরাদ্দের অর্থ ব্যয়, বনায়ন, কেনাকাটা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ‘টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল)’ প্রকল্পেও বনায়নের নামে অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া নথি তৈরি এবং পদায়ন ঘিরে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী ও তাঁর অনুসারী হিসেবে অভিযুক্ত একটি চক্র।
দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে নেওয়া বন অধিদপ্তরের ‘সুফল’ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন এ প্রকল্পের বনায়ন, কেনাকাটা এবং বিভাগীয় বন কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের মোট বাজেটের ১০ শতাংশ কমিশন দাবি এবং তা না দেওয়ায় প্রকল্প পরিচালককে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছে।
২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ এবং বদলি ও পদোন্নতিতে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযান চালায় দুদক। পরে বিভিন্ন তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহ করে সংস্থাটি। এসব অভিযোগের তদন্তে কর্মকর্তাও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা বিট এলাকায় কাগজে-কলমে বনায়ন দেখানো হলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। দুদকের নথিপত্র ও স্যাটেলাইট চিত্রের তথ্য অনুযায়ী, জোয়ারিয়ানালা বিটসহ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩৫০ হেক্টর জমিতে বনায়নের অস্তিত্ব নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। বনায়ন সম্পন্ন হয়েছে দেখিয়ে ভুয়া নথির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে বাঁশখালীর কালিপুরে ২০ হেক্টর জমিতে বনায়নের কথা থাকলেও বাস্তবে ১০ থেকে ১২ হেক্টর জমিতে তা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। হাটহাজারীতেও বনায়নের নামে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অবহেলা ও তদারকির অভাবে মীরসরাই রেঞ্জে প্রকল্পের আওতায় থাকা তিন লাখ চারা গায়েব ও নষ্ট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পরপর দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের সুবিধাজনক পদে নিয়োগ ও বদলি ঘিরেও বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। অভিযোগ রয়েছে, সুফল প্রকল্পের নীতিমালা লঙ্ঘন করে ঘুষ ও মাসোহারা আদায়ের মাধ্যমে পদায়নের একটি চক্র গড়ে তোলা হয়েছিল। ওই চক্রের বিরোধিতা করায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রকল্পের জনবলসহ এক দিনে ৭৭ জন কর্মচারীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বদলি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বনায়ন না করেই শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ‘সমৃদ্ধকরণ বাগান’ তৈরির নামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের নথিতে জালিয়াতি এবং অ-কাঠ বনজ পণ্যভিত্তিক (এনটিএফপি) বাগান তৈরির নামে ১৩ কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বনায়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের হিসাবেও অনিয়ম হয়েছে। নির্ধারিত ৫১০ হেক্টর জমিতে বনায়নের বিপরীতে বাস্তবে করা হয়েছে মাত্র ১৬০ হেক্টর। বিশ্বব্যাংকের স্যাটেলাইট যাচাই ও নিরীক্ষায় বনায়নের বাস্তব অস্তিত্ব না পাওয়ায় সুফল প্রকল্পের প্রদর্শিত বনায়ন এলাকার হিসাব থেকে ১১ হাজার ৫২৯ হেক্টর জমি বাদ দিতে হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্পের মোট বাজেট থেকে ১০ শতাংশ কমিশন দাবি করেছিলেন তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক। কমিশন না দেওয়ায় প্রকল্প পরিচালক রাকিবুল হাসান মুকুলকে সরিয়ে গোবিন্দ রায়কে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর প্রকল্পে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের অনিয়মের পাশাপাশি বন অধিদপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি ও পদায়ন ঘিরে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, যেসব এলাকায় বনভূমি বেশি কিংবা প্রকল্পের বরাদ্দ বেশি, সেসব এলাকার গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পেতে অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিভিন্ন চেকস্টেশনে পদায়নের ক্ষেত্রে একটি চক্র মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করত বলে অভিযোগ রয়েছে।
দেশের প্রায় ৪৫ জন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এবং চার শতাধিক রেঞ্জ ও বিভিন্ন চেকস্টেশন থেকে কোটি কোটি টাকা মাসোহারা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে মনিরুল ইসলাম, মো. আব্দুল আওয়াল সরকার, মিহির কুমার দো, বিপুল কৃষ্ণ দাস, মো. মাইন উদ্দিন, ড. গোবিন্দ রায় ও জাহেদুল কবিরের সমন্বয়ে একটি চক্র সক্রিয় ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বন অধিদপ্তরে বদলি, পদোন্নতি ও পদায়ন ঘিরে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ আগেও উঠে এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় এসব ক্ষেত্রে লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত বিধিবহির্ভূত লেনদেনের তথ্য তুলে ধরা হয়।
‘বন অধিদপ্তর: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বন অধিদপ্তরের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিভিন্ন ক্ষেত্র চিহ্নিত করে টিআইবি। এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. নেওয়াজুল মওলা জানান, প্রধান বন সংরক্ষক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে এক থেকে তিন কোটি টাকা বিধিবহির্ভূত লেনদেনের অভিযোগ পেয়েছেন তাঁরা।
টিআইবির গবেষণায় আরও বলা হয়, বন সংরক্ষক পদে নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি বা বদলিতে ১০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা এবং প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেতে এক থেকে দেড় কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। সহকারী বন সংরক্ষক পদে বদলির ক্ষেত্রেও এক থেকে পাঁচ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেঞ্জ কর্মকর্তা, চেকস্টেশন ইনচার্জ, ফরেস্টার, বিট কর্মকর্তা ও বন প্রহরী পদে বদলির ক্ষেত্রেও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব পদে বদলির জন্য প্রধান বন সংরক্ষকের দপ্তর এবং আঞ্চলিক ও বিভাগীয় বন কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশকে অর্থ দিতে হয় বলে টিআইবির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। রেঞ্জ কর্মকর্তা পদে বদলিতে পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা, চেকস্টেশন ইনচার্জ ও ফরেস্টার পদে ১০ থেকে ২৫ লাখ টাকা, বিট কর্মকর্তা পদে দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা এবং বন প্রহরী পদে ৫০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের তথ্য তুলে ধরা হয় ওই প্রতিবেদনে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের জনসংযোগ শাখার দায়িত্বে থাকা উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, গত বছর বন বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বন অধিদপ্তরে অভিযান চালিয়েছিল দুদক। পরে বিভিন্ন তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। বিষয়গুলো তদন্তের জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিনিধি/আরএইচ