মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনার চাপে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমছে। এর মধ্যে জ্বালানি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিও বাড়তি ঝুঁকিতে পড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আগামী বছর তা কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এমন চিত্র উঠে এসেছে। ‘রেজিলিয়েন্স আন্ডার স্ট্রেইন, আর্জেন্ট চয়েসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি নানা ধাক্কা সামলে টিকে থাকলেও সব দেশ সমানভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারছে না। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুবিধা পাওয়া দেশগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি চাপে রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে। এতে ডলারের চাহিদা, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় এবং উৎপাদন খরচের ওপর চাপ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে পণ্য ও সেবার দামে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। তবে ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ চলতি বছর সামান্য উন্নতির সম্ভাবনা থাকলেও আগামী বছরে অর্থনীতির গতি দুর্বল হতে পারে। বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এশিয়ার কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কম। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৬ সালে ভারতের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ শতাংশ, ভিয়েতনামের ৮ দশমিক ৪ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং চীনের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নেপালের সমান, ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
তবে বিভিন্ন দেশের অর্থবছর ও হিসাবের সময়সীমায় পার্থক্য থাকায় এসব পূর্বাভাস তুলনার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আরও উদ্বেগের বিষয় মূল্যস্ফীতি। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। কিন্তু ২০২৭ সালে আবার বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে।
এ পূর্বাভাস সত্য হলে আগামী বছর মূল্যস্ফীতি গত বছরের গড়কেও ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়তে পারে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সেই বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্যের দামে যুক্ত করলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্য, বাসস্থান, যাতায়াত ও চিকিৎসার ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আইএমএফের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য নিয়েও উদ্বেগের ইঙ্গিত রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্য ছিল জিডিপির প্রায় শূন্য শতাংশ। ২০২৬ সালে তা ঘাটতিতে পড়ে জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে ঘাটতি বেড়ে ২ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়লে আমদানি ব্যয়, রফতানি আয়, প্রবাসী আয় ও সেবা খাতের বৈদেশিক লেনদেনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি বিল বাড়তে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে চলতি হিসাবের ঘাটতির পূর্বাভাস থেকেই রিজার্ভ বা ডলারের বাজারে ঠিক কতটা চাপ তৈরি হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। এর জন্য রফতানি, প্রবাসী আয়, মূলধনি প্রবাহ এবং অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
আইএমএফের প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল। জুনের শুরুতে দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি স্থিতিশীল হয়। সেপ্টেম্বরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধের আগের স্তরের ৮৮ শতাংশে পৌঁছায়।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ২০২৫ সালের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি থাকতে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়তে পারে ৪৮ শতাংশ।
বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব বহুমুখী। জ্বালানি আমদানিতে বেশি ডলার ব্যয় হলে অন্য পণ্য আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে। জ্বালানি ব্যয় বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন ও কৃষির উৎপাদন খরচেও প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ রফতানিমুখী শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। অপরদিকে বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হলে রফতানি আয়ের ওপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইএমএফের বিশ্লেষণে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ধরনের বিভাজনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। একদিকে রয়েছে জ্বালানি রফতানিকারক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত দেশগুলো। অপরদিকে রয়েছে জ্বালানি আমদানিনির্ভর এবং প্রযুক্তি খাতে কম সম্পৃক্ত দেশগুলো।
প্রথম গোষ্ঠীর দেশগুলো জ্বালানি রফতানি বা প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ থেকে সুবিধা পাচ্ছে। দ্বিতীয় গোষ্ঠীকে বেশি আমদানি ব্যয়, দুর্বল চাহিদা এবং সীমিত সরকারি আর্থিক সক্ষমতার চাপ সামলাতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হলেও বৈশ্বিক এআই প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় দেশের অংশগ্রহণ তুলনামূলক সীমিত। ফলে আইএমএফের বর্ণিত ঝুঁকির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার মিল রয়েছে। তবে প্রতিবেদনের এই বিশ্লেষণ বাংলাদেশের জন্য আলাদা কোনো ঝুঁকি-পরিমাপ নয়।
জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে সরকার কীভাবে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেবে, সে বিষয়েও পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, সবার জন্য ব্যাপক ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সাময়িক ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া বেশি কার্যকর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে বাজারদর কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখার ব্যবস্থা নিতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার তুলনায় তিন থেকে ২২ গুণ পর্যন্ত বেশি সরকারি অর্থ ব্যয় হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পরামর্শের গুরুত্ব রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা ও কার্যকারিতা বাড়ানো এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে রাজস্ব আয় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো এবং ঋণের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি নির্ধারণের সময়ও প্রতিটি দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দেশবার্তা/এমআর