রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি ও তাঁর পদত্যাগের দাবিতে ‘ঘৃণা মঞ্চ’ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সোমবার (১০ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দপ্তর প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়।
কর্মসূচির শুরুতে উপস্থিত শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাংবাদিক, সচেতন নাগরিক ও শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো দৃশ্যমান কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোয় প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন শিক্ষার্থীরা। পরে ‘গফুর’ লেখা চেয়ারে প্রতীকীভাবে স্মারক অর্পণ করা হয়। প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ-সংক্রান্ত ২০ লাখ টাকা লেনদেনের বিষয়ে অডিও-ভিডিওতে উপস্থাপিত বক্তব্যও মাইকে প্রচার করা হয়।
কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
শিক্ষার্থীরা জানান, গত ২৮ জুলাই শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালক আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে নিয়োগ-সংক্রান্ত অসঙ্গতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আর্থিক লেনদেন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক আচরণ-সংক্রান্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা দাবি করা হয়। পরে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। একাধিকবার আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করা হয়।
রাবিপ্রবির উন্নয়ন প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে এক দিনের সাইট ভিজিটে ৭৪ হাজার ৫৯৯ টাকা খরচ দেখানো, ৮০ হাজার টাকা মূল্যের টেবিল ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং সামান্য কাজ করেই ৩৯ লাখ টাকা বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এ ছাড়া তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়া, টেন্ডার কার্যক্রম, ঘুষ লেনদেন, বিল-ভাউচার জালিয়াতি, সরকারি অর্থ দ্বৈতভাবে দাবি (ডাবল ক্লেইম), প্রকল্প পরিচালনায় অদক্ষতা, বিশ্ববিদ্যালয়ে আধিপত্য বিস্তার এবং কোটি টাকা অপচয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে অস্থিতিশীল করার মতো অভিযোগও রয়েছে।
জানা গেছে, নেইমপ্লেট ও গেট নির্মাণকাজ শুরুর আগেই ২০২৫ সালের ২৪ জুন প্রকৌশলীদের স্বাক্ষর ছাড়াই ৩৯ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কাজ পাওয়া ও বিল উত্তোলনের জন্য ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়া হতো। কমিশন না দিলে ঠিকাদারদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হতো। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে কমিশন দিতেন এবং এতে কাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হতো।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চারটি ভবন নির্মাণে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তদারকি থাকলেও প্রকল্প পরিচালক হিসেবে আবদুল গফুর ঠিকাদারদের সঙ্গে সরাসরি লেনদেন এবং বিল পরিশোধে হস্তক্ষেপ করতেন। কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান শেলটেক প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গেও তাঁর অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
একটি নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর এক দিনের প্রশিক্ষণের জন্য ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম নেওয়া হয় এবং ১১ নভেম্বর তা সমন্বয় দেখানো হয়। পাশাপাশি ডিএও উত্তোলন করা হয়। অন্য একটি নথিতে দেখা গেছে, একজন কর্মচারীর নামে অগ্রিম নেওয়া হলেও তাঁর স্বাক্ষর নেই। একই কাজে আবদুল গফুর নিজের নামেও বড় অঙ্কের অর্থ উত্তোলন করেছেন এবং ডিএ গ্রহণ করেছেন।
সূত্র মতে, ভ্রমণ বা প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে এ ধরনের অগ্রিম নেওয়ার বিধান নেই। অভিযোগ রয়েছে, ব্যক্তিগত কাজে ঢাকা সফর করেও তিনি বারবার অগ্রিম ও ডিএ গ্রহণ করেছেন এবং ভুয়া বিল-ভাউচার দেখিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। কর্মচারীদের নাম ব্যবহার করে জোরপূর্বক অগ্রিম তুলে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকায় আবদুল গফুরকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ আছে, প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) রিপোর্ট ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন না নিয়েই ভবন নির্মাণ শুরু করা হয়। অতিরিক্ত পাহাড় কাটার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা করে।
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এরপরও তিনি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান শেলটেক প্রাইভেট লিমিটেড কাজ পরিদর্শনে এলে এক দিনের ভিজিটে আবদুল গফুর নিজের নামে ৭৪ হাজার ৫৯৯ টাকা বিল করেন। এতে বোট ভাড়া, গাড়ি ভাড়া, স্টেশনারি ও আপ্যায়নসহ বিভিন্ন খাতে অতিরঞ্জিত ব্যয় দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কনসালটেন্টদের সঙ্গে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে তাঁরা নিয়মিত তদারকি না করে মাসে এক বা দুইবার আসতেন। প্রতিবার তাঁদের আগমন উপলক্ষে লাখ লাখ টাকার ভুয়া খরচ দেখানো হতো।
মাস্টারপ্ল্যান-সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা গেছে, প্রকল্প পরিচালক আবদুল গফুরের নামে ১৯ লাখ ৬৮ হাজার ৫২২ টাকা, প্রকল্পের কর্মচারী মার্শাল চাকমার নামে ১৪ লাখ ৭ হাজার ৩২৮ টাকা, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার টাইপিস্ট নিশান চাকমার নামে ১২ লাখ ৯ হাজার টাকা, সেকশন অফিসার আবদুল হকের নামে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫০ টাকা এবং মনজুরুল ইসলামের নামে ১৭ লাখ ৩৭ হাজার ৫৬৮ টাকা অগ্রিম দেখিয়ে ব্যয় করা হয়েছে। আরও অনেকের নামে স্বাক্ষর ছাড়াই অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ স্লোগান দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে সত্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পক্ষে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকদের একাত্ম হওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।
প্রতিনিধি/একে