সারাদেশে ফের তীব্র রূপ নিয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। জ্বালানি ঘাটতি, কারিগরি ত্রুটি ও মূলধন সংকটে দেশের অর্ধেকের বেশি উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকায় প্রতিনিয়ত মারাত্মক লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অধীনস্থ গ্রামাঞ্চল এবং মফস্বল এলাকাগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম জনভোগান্তি তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্যমতে, গত কয়েক দিন ধরে দিনে সর্বোচ্চ ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট, যা তার আগের দিন ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিন অর্ধেকেরও বেশি সক্ষমতা বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, গ্যাসসংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে জ্বালানি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দিনভর চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
এছাড়া কয়লাসংকটের কারণে বড় তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে পটুয়াখালীর দুটি কেন্দ্র ও ভারতের ঝাড়খণ্ডের আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরবরাহ কমেছে। আদানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১২ আগস্টের মধ্যে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, গ্যাসের স্বল্পতা ও কয়লা থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছিল তেলচালিত কেন্দ্র। তবে পুরো দিন তেলচালিত কেন্দ্র চালানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই সন্ধ্যার পর লোডশেডিং সহনীয় রাখতে উৎপাদন বাড়ানো হয় এবং মধ্যরাতের পর আবার তা কমিয়ে দেওয়া হয়।
বিপুল বকেয়া বকেয়া ও অর্থনৈতিক সংকট বিদ্যুৎ খাতের এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিগত সরকারের আমলে দফায় দফায় দাম বাড়ানো হলেও এখনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বাবদ পিডিবির পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। জুনে পাইকারি পর্যায়ে ১৯.৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৬.৬৮ শতাংশ দাম বাড়ানো হলেও এর সুফল এখনো পিডিবির তহবিলে জমা হয়নি।
এদিকে রাজধানী ঢাকায় ডেসকো ও ডিপিডিসির সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকলেও চরম দুর্ভোগে পড়েছে ঢাকার বাইরের ও গ্রামাঞ্চলের মানুষ।
জানা গেছে, ফেনী জেলায় প্রতিদিন প্রায় ৩০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে। ফলে স্থানীয় শিল্পকারখানায় দৈনিক ৩৫ শতাংশ সময় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। নেত্রকোনায় ১৫৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫৯ মেগাওয়াট। ফলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রাহকরা ৪-৫ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। হবিগঞ্জে কোথাও কোথাও প্রায় ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে চুনারুঘাটের চা-বাগানগুলোতে প্রক্রিয়াজাতকরণের অপেক্ষায় থাকা কাঁচা চা-পাতা নষ্ট হয়ে আর্থিক ক্ষতির সৃষ্টি হচ্ছে।
কেরানীগঞ্জে ২৪০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিন প্রায় ৮০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকায় তীব্র গরমে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। নীলফামারীর ডোমার উপজেলায় চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়ায় দৈনিক ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ মিলছে না। গ্রাহকদের অসন্তোষের মুখে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পুলিশি নিরাপত্তা চেয়ে থানায় আবেদন করেছে স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
পিডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফলে বকেয়া আর না বাড়লেও পুরোনো বকেয়া শোধ করতে সময় লাগবে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়লে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হতে পারে।
দেশবার্তা/একে