বারবার গর্ভপাতের পেছনে এত দিন চিকিৎসকেরা মূলত নারীর শারীরিক ও প্রজননস্বাস্থ্যের বিভিন্ন কারণ খুঁজে দেখেছেন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে পুরুষের শুক্রাণুর স্বাস্থ্য, বিশেষ করে শুক্রাণুর ডিএনএ কতটা অক্ষত আছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গবেষণাগুলো বলছে, শুক্রাণুর ডিএনএতে ক্ষতি থাকলে গর্ভধারণের পর ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে এবং গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এর এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা ও চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসের একটি ফার্টিলিটি সেন্টারে চিকিৎসা নিতে আসা ৩২ বছর বয়সী এক দম্পতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাঁচ বছর ধরে তাঁরা সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এর মধ্যে একাধিকবার আইভিএফ চিকিৎসা ব্যর্থ হয়। কয়েকবার গর্ভপাতের পাশাপাশি ভ্রূণ স্থানান্তর ব্যর্থ হয় এবং ‘কেমিক্যাল প্রেগন্যান্সি’ নামে পরিচিত অতি-প্রাথমিক গর্ভধারণও টেকেনি।
দম্পতির প্রচলিত প্রায় সব পরীক্ষাই করা হয়েছিল। নারীর রক্ত পরীক্ষা ও জরায়ুর গঠন পরীক্ষা করা হয়। পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা, ঘনত্ব ও গতিশীলতাও পরীক্ষা করা হয়েছিল। এসব পরীক্ষায় বড় কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি। এরপর প্রজনন চিকিৎসক ক্যারি বেডিয়েন্ট পুরুষটির শুক্রাণুর ডিএনএতে ক্ষতি বা ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন আছে কি না, তা পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।
পরীক্ষায় তাঁর শুক্রাণুর ডিএনএতে মাঝারি মাত্রার ক্ষতি ধরা পড়ে। এরপর জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেওয়া হয়। তিনি মদ্যপান ও ধূমপান বন্ধ করেন, ব্যায়াম শুরু করেন এবং ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট নিতে থাকেন। ছয় মাস পর দম্পতি আবার ভ্রূণ তৈরি করেন। এবার তাঁদের একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়।
চিকিৎসকদের মতে, পুরুষের বন্ধ্যাত্ব মূল্যায়নে এত দিন মূলত বীর্যের পরিমাণ ও ঘনত্ব, শুক্রাণুর আকৃতি এবং শুক্রাণুর চলাচলের ক্ষমতা দেখা হতো। কিন্তু এসব পরীক্ষায় শুক্রাণুর ভেতরের জিনগত উপাদান বা ডিএনএ কতটা অক্ষত রয়েছে, তা জানা যায় না। সাম্প্রতিক গবেষণায় এই জায়গাটিই গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিভিন্ন গবেষণায় শুক্রাণুর ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশনের সঙ্গে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। নতুন কিছু গবেষণা আরও বলছে, শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতি আইভিএফের মাধ্যমে জীবিত সন্তান জন্মের সম্ভাবনা কমাতে এবং ভ্রূণের প্রাথমিক বিকাশে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তবে শুক্রাণুর ডিএনএ পরীক্ষা একেবারে নতুন নয়। প্রায় ১৫ বছর ধরেই এ ধরনের পরীক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু এত দিন এটি সাধারণ চিকিৎসার অংশ হয়ে ওঠেনি। এর অন্যতম কারণ, পরীক্ষায় সমস্যা ধরা পড়লেও এরপর কী ধরনের চিকিৎসা সবচেয়ে কার্যকর হবে, তা নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে স্পষ্ট ঐকমত্য ছিল না।
এ ছাড়া শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কারণও পুরোপুরি জানা যায়নি। পরিবেশের বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শ, বেশি বয়সে বাবা হওয়া, ধূমপান, মাদক গ্রহণ ও কিছু জীবনযাপনগত অভ্যাসকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরীক্ষাটির খরচও অনেকের জন্য একটি বাধা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের পরীক্ষায় প্রায় ৫০০ ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে এবং সব স্বাস্থ্যবিমা এর ব্যয় বহন করে না।
পুরুষের মূল্যায়নে গুরুত্ব
বারবার গর্ভপাতের চিকিৎসা নিয়ে আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিন (এএসআরএম) সম্প্রতি নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। ১৪ বছর পর হালনাগাদ করা এই নির্দেশিকায় একাধিকবার গর্ভপাতের ঘটনা ঘটলে শুক্রাণুর ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টেশন পরীক্ষা বিবেচনা করা যেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এএসআরএম এখনো এই পরীক্ষা সবার জন্য সরাসরি সুপারিশ করেনি। কারণ, শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতি কমানোর চিকিৎসার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত গর্ভধারণের ফলাফল কতটা উন্নত হয়, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তবু চিকিৎসকদের কাছে নির্দেশিকাটির এই অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজনন ও হরমোন বিশেষজ্ঞ ক্লারিসা গ্রাসিয়ার মতে, কোনো দম্পতি সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করলে পুরুষকে প্রজনন সমস্যার মূল্যায়ন থেকে বাদ দেওয়া উচিত নয়। কারণ, পুরুষের স্বাস্থ্যও সন্তান ধারণ ও গর্ভধারণের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
আমেরিকান ইউরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ্যাত্বের প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে পুরুষজনিত কারণ এককভাবে দায়ী। আরও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ- উভয়ের কারণ একসঙ্গে কাজ করে।
ডিএনএ যেন নির্দেশিকা
গর্ভপাতের সঙ্গে শুক্রাণুর সম্পর্ক নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ধারণাটি তুলনামূলকভাবে নতুন। কয়েক দশক আগেও গর্ভপাতের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর ভূমিকা নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে তেমন আলোচনা ছিল না। পরে এমন কিছু ঘটনা চিকিৎসকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যেখানে কোনো নারী এক সঙ্গীর সঙ্গে সন্তান ধারণে ব্যর্থ হওয়ার পর অন্য সঙ্গীর সঙ্গে সন্তান জন্ম দিয়েছেন।
বস্টন আইভিএফের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডেনি সাক্কাস ১৯৯০-এর দশকেই বন্ধ্যাত্বে আক্রান্ত পুরুষদের শুক্রাণুর ডিএনএ নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি শুক্রাণুর ডিএনএতে ছোট ছোট ভাঙন দেখতে পান।
তিনি ডিএনএকে একটি নির্দেশিকা বই বা ‘অপারেটিং ম্যানুয়াল’ এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডিএনএতে অনেক ত্রুটি থাকলেও গর্ভধারণ শুরু হতে পারে। কিন্তু ভ্রূণের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ কোনো পর্যায়ে ত্রুটির প্রভাব পড়লে গর্ভধারণ আর এগিয়ে নাও যেতে পারে।
এই ধারণা থেকেই বারবার গর্ভপাতের ঘটনায় পুরুষের শুক্রাণুকে আরও গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করার পক্ষে চিকিৎসকদের একটি অংশের আগ্রহ বাড়ছে। একই সঙ্গে উন্নত ও তুলনামূলক কম খরচের ডিএনএ পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর শুক্রাণু বাছাইয়ের নতুন প্রযুক্তিও তৈরি হচ্ছে।
কিছু নতুন প্রযুক্তিতে তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যকর শুক্রাণু শনাক্ত করে সেটিকে সরাসরি ডিম্বাণুর মধ্যে প্রবেশ করানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এসব পদ্ধতি কতটা কার্যকর এবং কোন রোগীর ক্ষেত্রে এগুলো ব্যবহার করা উচিত, তা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
শুধু নারীর সমস্যা নয়
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই পরিবর্তনের সামাজিক গুরুত্বও রয়েছে। সন্তান ধারণে সমস্যা বা বারবার গর্ভপাতের জন্য অনেক সময় নারীকেই এককভাবে দায়ী করা হয়। এতে নারীর ওপর মানসিক চাপ বাড়ে। একই সঙ্গে পুরুষেরাও বন্ধ্যাত্বের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক লজ্জা ও আত্মগ্লানিতে ভুগতে পারেন।
চ্যাপম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্রেনান পিটারসনের মতে, পুরুষত্বকে অনেক সময় প্রজননক্ষমতার সঙ্গে এক করে দেখা হয়। ফলে সন্তান জন্ম দিতে না পারলে কিছু পুরুষ নিজেদের পুরুষত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। এর সঙ্গে লজ্জা, বিষণ্নতা এবং সমস্যাটি গোপন রাখার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।
এএসআরএমের নতুন নির্দেশিকায় পুরুষের ভূমিকা স্বীকার করার বিষয়টি তাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে বন্ধ্যাত্ব ও বারবার গর্ভপাতকে শুধু নারীর সমস্যা হিসেবে দেখার প্রবণতা কমতে পারে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে দিচ্ছেন, শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতি ও গর্ভপাতের মধ্যে সম্পর্কের প্রমাণ বাড়লেও এটিকে সব ক্ষেত্রে গর্ভপাতের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা যাবে না। গর্ভপাতের পেছনে নারী ও পুরুষ উভয়ের বিভিন্ন শারীরিক, জিনগত ও অন্যান্য কারণ থাকতে পারে।
ফলে বারবার গর্ভপাত হলে শুধু নারীর পরীক্ষা নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যেরও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। গবেষণা আরও এগোলে শুক্রাণুর ডিএনএ পরীক্ষা ভবিষ্যতে বারবার গর্ভপাতের কারণ অনুসন্ধান ও চিকিৎসা পরিকল্পনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
দেশবার্তা/একে