এসেছে রবিউল আওয়াল মাস। হেমন্তের শেষে শীতের আবেশ অনুভূত হচ্ছে। লোকজন অতীব আগ্রহের সাথে রবিউল মাসের ১২ তারিখের অপেক্ষায় থাকে। ১২ই রবিউল আওয়াল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ একটি দিন, কারণ এই দিনে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মহামানব, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এই ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
রবিউল আওয়াল মাসের ১লা তারিখ হতে আজিমপুর দায়রা শরিফে (ঢাকা) রাসূল করিম (সা.)-এর স্মরণে শুরু হয় দোয়া, খতম, মিলাদ। এই দরবারের ছিলছিলা অনুযায়ী চূড়ান্তভাবে পালিত হয় ১২ই রবিউল আওয়াল। রাত্রিটি উদ্যাপিত হয় বিরাট আড়ম্বরতার সাথে। উক্ত অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ “কদম রাসূল”। দোয়া, খায়ের, ওয়াজ শেষে এশার নামাজ, এরপর “কদম রাসূল” (পাথরের উপর রাসূলের পায়ের ছাপ) বের হয়। এই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে এই দায়রা শরিফে লোকসমাগম হয়।
অতি ভক্তিভরে লোকজন এই কদম রাসূলকে চুমু খায়। অতি আবেগাপ্লুত হয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে। এই ধরনের অনুষ্ঠান এই দরবারে পরম্পরা হিসাবে চলে আসছে। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন দায়রা শরিফের বর্তমান গদ্দিনশীন। সৈয়দ শাহ এনামুল্লাহ (যোহার)-এর সম্পূর্ণ বিষয়টির প্রক্রিয়া রাসূলের ভালোবাসার আবেগতাড়িত বহিঃপ্রকাশ।
পরিশুদ্ধ, মহান আল্লাহর প্রতিনিধি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মক্ষণের দৃশ্যপটের অবতারণা করা হলো-
রবিউল আওয়াল মাস। শীতের অবসান প্রায়, তরু-শাখা-প্রশাখায় নব পত্র-পল্লব প্রায় সমাগত। এমন এক দিনে, রাতের শেষ প্রহরে, হালকা শীতের স্নিগ্ধ বাতাস প্রবাহিত হচ্ছিল। পবিত্র মক্কা নগরীর উঁচু-নিচু ভূমিতে প্রভাতি আলোকশিখা শুভাগমনী বার্তা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল। ঠিক এমন শুভ মুহূর্তে আরবের মরু-দিগন্তে মক্কা নগরীর এক জীর্ণ কুটিরের এক নিভৃত কক্ষে বিবি আমিনা সুখ-স্বপ্নদৃষ্টে বিভোর।
তিনি দেখছিলেন, এক অপূর্ব নূরে আসমান-জমিন আলোকিত হয়ে গেছে। কার যেন আজ শুভাগমনী, কার যেন আজ অভিনন্দন। কুল মাখলুকাত (সৃষ্ট সবকিছু) আজ আনন্দে আত্মহারা। গগনে গগনে ফেরেশতারা ছোটাছুটি করছেন। তোরণে তোরণে বাঁশি বাজছে। সবাই আজ বিস্মিত, পুলকিত, কল্পিত ও শিহরিত। জড় প্রকৃতির অন্তরেও আজ দোলা লাগছে।
বিবি আমিনার কুটিরেই আজ কী অপরূপ দৃশ্য! কারা এই শুভ্রবসন পুণ্যময়ী রমনীবৃন্দ? বিবি হাওয়া, বিবি হাজেরা, বিবি আসিয়া শিয়রে দণ্ডায়মান। বেহেশতী নূরে সারা ঘর আজ নূরান্বিত, বেহেশতী খুশবুতে বাতাস আজ সুরভিত। এক স্নিগ্ধ, শান্ত আমেজের মধ্য দিয়ে আমিনার স্বপ্ন ভাঙল। এমন শুভ মুহূর্তে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ই রবিউল আওয়াল, রোজ সোমবার, সুবহে সাদেকের সময় দুনিয়াতে শুভাগমন করলেন। তিনি সম্পূর্ণ কলুষমুক্ত হয়ে পৃথিবীতে শুভাগমন করেছিলেন। জন্মগতভাবেই তাঁর মুসলমানি করা ছিল। এবং হযরত জিব্রাইল (আ.) নিজে তাঁর নাড়ি কেটেছিলেন।
রাসূল করিম (সা.)-এর জন্মের পর “আল-মুশতারী” নক্ষত্র অস্তমিত হলে একটি আলোর রেখা দ্বিতীয় বারের মতো আমিনার দেহ থেকে বের হয়ে তা তীরবেগে ধাবমান হয়ে সিরিয়া অতিক্রম করে বহুদূরে চলে যায় এবং তা বসরা শহরের রাজপ্রাসাদকে আলোকিত করে। একই সঙ্গে বহু বিস্ময়কর ঘটনা বিশ্বের মানুষকে চমকে দিয়েছিল। আর সোয়া হ্রদের পানি হঠাৎ শুকিয়ে গিয়েছিল। প্রবল ভূমিকম্পে পারস্য সম্রাট মহামতি খসরুর রাজপ্রাসাদ কেঁপে উঠেছিল। যে বহ্নিশিখা পারস্য দেশে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রজ্জ্বলিত ছিল, তা নিভে গেল। পারস্যে অগ্নিপূজকগণ ওই শিখা যুগ যুগ ধরে জ্বালিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হলেন।
দেশবার্তা/কেএ/একে