জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি করতে দেশে ফেরত আনতে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। সবশেষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আলোচনায়ও অন্যতম মূল এজেন্ডা হিসেবে উঠে এসেছে প্রত্যর্পণ চুক্তির মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়টি। ঢাকার এমন অবস্থানের প্রেক্ষিতে এবার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে ভারতের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
রোববার (১৬ আগস্ট) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে মোদি সরকার নয়; বরং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ভারতের বিচারবিভাগ ও আদালত।
ভারতের এক শীর্ষ কর্মকর্তা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হস্তান্তরের সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত আমাদের আদালত নেবে; এটি কোনও রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে না। আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় এটিই যাচাই করা হবে যে, ঢাকার পক্ষ থেকে যে অপরাধগুলো সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা ভারতীয় আইনেও অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত কি না।’
অপর এক কর্মকর্তা জানান, শেখ হাসিনা নিজেই চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তবে, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধকে দিল্লি ও ঢাকার বর্তমান কূটনৈতিক আলোচনার বাইরে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তীব্র আলোচনা চলছে এবং উভয় পক্ষই সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে সরে এসে সমাধানের পথ খুঁজছে বলে জানান তিনি।
এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তান্তরের অনুরোধের বিষয়ে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, “আমরা আমাদের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুযায়ী বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখছি এবং এ বিষয়ে নতুন কোনও আপডেট থাকলে পরবর্তীতে জানানো হবে।”
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৩ সালের দ্বিপক্ষীয় বন্দি বিনিময় চুক্তির বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব আইনি নথি সংযুক্ত করেই শেখ হাসিনাকে ফেরানোর এই আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ।
২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, অভিযুক্ত, দোষী সাব্যস্ত বা আদালতের দণ্ড কার্যকর করার জন্য কোনও অপরাধীকে ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, হস্তান্তরযোগ্য কোনও অপরাধের ক্ষেত্র তৈরি হলে তা চুক্তিভুক্ত অপর দেশের ‘বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ’ নিষ্পত্তি করবে।
অবশ্য চুক্তির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ‘রাজনৈতিক প্রকৃতির’ অপরাধগুলো হস্তান্তরের আওতাভুক্ত হবে না। তবে এতে হত্যা, অনৈচ্ছিক নরহত্যা, হামলা, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ও হত্যায় প্ররোচনার মতো ১২টি সুনির্দিষ্ট অপরাধকে তালিকাভুক্ত করে বলা হয়েছে- এগুলোকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
এছাড়া ভারতের ১৯৬২ সালের প্রত্যর্পণ আইনের বিধানাবলিও এক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যা পালিয়ে আসা অপরাধীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেয়। এই আইন অনুযায়ী, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিপিভি (কনস্যুলার, পাসপোর্ট অ্যান্ড ভিসা) বিভাগ প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত বিষয়ে নোডাল অফিস হিসেবে কাজ করে। চুক্তি বা সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে মন্ত্রণালয় উপযুক্ত মনে করলে পুরো বিষয়টি তদন্তের জন্য একজন ইনকোয়ারি (তদন্তকারী) ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করতে পারে।
আইনে বলা হয়েছে, যদি ইনকোয়ারি ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তকে হস্তান্তরের উপযুক্ত মনে করেন, তবে তিনি প্রতিবেদনে হস্তান্তরের সুপারিশ করবেন।
অন্যদিকে, তদন্ত শেষে যদি ম্যাজিস্ট্রেট মনে করেন যে আবেদনকারী দেশের দাবির সপক্ষে প্রাইমা ফেসি (প্রাথমিক সত্যতা) কোনো মামলা গড়ে ওঠেনি, তবে তিনি উক্ত ব্যক্তিকে মুক্তির নির্দেশ দেবেন।
দেশবার্তা/একে