সৌদি আরবের তায়েফ শহরে কামরুল হোসেন (৩৭) নামের এক বাংলাদেশি শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। রোববার (৩০ আগস্ট) ভোরে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে এক সৌদি তরুণ তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। হামলার সময় কামরুল তার স্ত্রী হালিমা বেগম স্বপ্নার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। ফোনে গুলির শব্দ ও তার আত্মচিৎকার শুনতে পান স্ত্রী। পরে হামলাকারী নিজেও গুলি করে আত্মহত্যা করেন।
নিহত কামরুল হোসেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খোরশেদ আলমের ছেলে। তিনি তায়েফ শহরের একটি সুপার মার্কেটে কাজ করতেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, সৌদি সময় রোববার ভোর ৪টার দিকে কাজ শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন কামরুল। এ সময় হঠাৎ এক সৌদি তরুণ তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
গুলির মুখে কামরুল দৌড়ে মার্কেটের ভেতরে ঢুকে পড়েন। এ সময় মার্কেটে কর্মরত আরও দুই কর্মী আতঙ্কে পালিয়ে যান। পরে হামলাকারীও মার্কেটের ভেতরে ঢুকে কামরুলকে পরপর তিন রাউন্ড গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে হামলাকারী নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। তবে কী কারণে ওই তরুণ কামরুলকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
কামরুলের স্ত্রী হালিমা বেগম স্বপ্না জানান, স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় হঠাৎ গুলির শব্দ ও তার আত্মচিৎকার শুনতে পান। এরপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে সৌদিতে থাকা স্বজন ও সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কামরুলের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়।
কামরুলের ছোট ভাই মোজাম্মেল হোসেন মোহন জানান, তারা চার ভাই ও এক বোন। এর আগে তাদের আরেক ভাই আনোয়ার হোসেনও সৌদি আরবে মারা যান। ২০১৭ সালে সৌদি আরবে যাওয়া আনোয়ার বৈধ কাগজপত্র না থাকায় রিয়াদের একটি সোফা কারখানায় কাজ করতেন। ২০২৪ সালে ওই কারখানায় আগুন লাগলে অগ্নিদগ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অর্থের অভাবে তার মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়নি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, আনোয়ারের মৃত্যুর মাত্র তিন মাস আগে কামরুলও সৌদি আরবে যান। দুই ভাই বিদেশ যাওয়ার সময় পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছিল। তাদের বাড়ির থাকার ঘরটিও জরাজীর্ণ। বাড়িতে নতুন ঘর নির্মাণের স্বপ্ন ছিল আনোয়ারের।
আগামী শুক্রবার ছোট বোনের বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। বোনের বিয়ে নিয়ে মা জাহানারা বেগমের সঙ্গে শেষবার কথা বলেছিলেন কামরুল। পরিবারের সদস্যরা জানান, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের দাওয়াত দিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান ধুমধাম করে আয়োজনের কথা বলেছিলেন তিনি।
কামরুলের ভগ্নিপতি ও সৌদি প্রবাসী একরামুল হক রনি জানান, চার বছর আগে কামরুলের বিয়ে হয়। বোনের বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তিনি গত সপ্তাহে দেশে আসেন। পরে সৌদিতে থাকা সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কামরুলের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।
কামরুল দুই ছেলে সন্তানের বাবা। তার বড় ছেলের বয়স পাঁচ বছর এবং ছোট ছেলের বয়স তিন বছর। বাবা খোরশেদ আলম একজন প্রান্তিক কৃষক। পরপর দুই ছেলের মৃত্যুতে শোকাহত পরিবারটি এখন ঋণের টাকা পরিশোধ, দুই শিশুর ভবিষ্যৎ এবং সংসার চালানো নিয়ে দিশেহারা।
কামরুলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন তার স্বজনরা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা কামনা করেছেন।
কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জাফর উল্যাহ বলেন, কামরুলের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এর আগে তার আরেক ভাইও সৌদি আরবে আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন।
৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নসির উদ্দিন বলেন, ‘কী কারণে ওই সৌদি তরুণ কামরুলকে গুলি করে হত্যা করেছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে এমন মৃত্যুর খবরে আমরা সবাই শোকাহত। অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি।’
দেশবার্তা/এসআইএস/একে