ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালে সমুদ্রে মোতায়েনের রেকর্ড গড়ে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। এসময় রণতরীটির নেতৃত্বাধীন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের দায়িত্বে থাকা মার্কিন নৌবাহিনীর আট সদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও-র একটি চিঠির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বহরটির সঙ্গে থাকা কয়েকটি জাহাজের সদস্যদের এ হিসাবের মধ্যে ধরা হয়েছে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের মনোবল ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সিনেটর কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ডের করা প্রশ্নের লিখিত জবাবে এ তথ্য জানান কাও। তিনি বলেন, মোতায়েনের সময় কোনো নৌসদস্য আত্মহত্যা করেননি।
লিংকন স্ট্রাইক গ্রুপের নাবিকদের আত্মহত্যার চেষ্টার হার ২০২৪ সালে পুরো সক্রিয় দায়িত্বে থাকা মার্কিন নৌবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টার হারের প্রায় কাছাকাছি। পেন্টাগনের প্রকাশ করা সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ৩ লাখ ৩৭ হাজার সক্রিয় দায়িত্বে থাকা নৌসদস্যের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন ৩৫৬ জন।
২২ সেপ্টেম্বর তারিখ দেয়া চিঠিতে কাও লিখেছেন, ‘লিংকনের মোতায়েনের শুরু থেকে পুরো স্ট্রাইক গ্রুপে মোট আটটি আত্মহত্যার চেষ্টা হয়েছে। এর মধ্যে লিংকনের ক্রু এবং বিমানবাহী রণতরীর এয়ার উইং, স্ট্রাইক গ্রুপ ও ডেস্ট্রয়ার স্কোয়াড্রনের স্টাফ, সঙ্গে থাকা ডেস্ট্রয়ার এবং মোতায়েন করা সব বিমান স্কোয়াড্রনের নাবিকরা অন্তর্ভুক্ত।’
প্রায় অর্ধডজন জাহাজ নিয়ে গঠিত লিংকন স্ট্রাইক গ্রুপের অংশ হিসেবে ৬-৭ হাজার মার্কিন নৌসদস্য মোতায়েন ছিলেন। ইরানের বিরুদ্ধে উচ্চমাত্রার সামরিক অভিযান চালানোর সময় বিমানবাহী রণতরীটি ছয় মাসেরও বেশি সময় কোনো বন্দরে না গিয়ে সমুদ্রে ছিল।
এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ‘আটটি আত্মহত্যার চেষ্টা অবিশ্বাস্য রকম বেশি।’ সাম্প্রতিক ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপগুলোর মোতায়েনে বছরে সাধারণত এক বা দুটি এমন ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ অভিযানের চাপ স্বাভাবিক মোতায়েনের চেয়ে অনেক বেশি। বন্দরে কোনো যাত্রাবিরতি নেই, সার্বক্ষণিক সতর্কতা—সবকিছুই এর মধ্যে রয়েছে।’
ডেমোক্র্যাট সিনেটর এবং সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সদস্য গিলিব্র্যান্ড গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ট্রাম্প ও (প্রতিরক্ষামন্ত্রী) হেগসেথ যেটিকে “ভুয়া খবর” বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেটিই আমাদের সামরিক সদস্যদের গুরুতর ও অবনতিশীল পরিস্থিতি হিসেবে দেখা দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সেনাসদস্য ও তাদের পরিবার প্রতিদিন বিপুল ত্যাগ স্বীকার করছেন। অথচ প্রেসিডেন্ট তাদের প্রতি প্রকাশ্য অসম্মান দেখিয়ে বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছেন। এ প্রশাসন বোমা, বলরুম ও বিলিয়নিয়ারদের জন্য করদাতাদের অর্থের অন্তহীন ব্যবস্থা করতে পারে, কিন্তু সামরিক সদস্যদের দেখভাল করতে পারে না—এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’
কাওয়ের চিঠি অনুযায়ী, লিংকনে বিভিন্ন ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ছিল। এর মধ্যে ছিলেন পাঁচজন চ্যাপলিন, একজন সমন্বিত প্রতিরোধবিষয়ক পরামর্শক, একজন মনোবিজ্ঞানী, একজন ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার, তিনজন আচরণগত স্বাস্থ্যবিষয়ক টেকনিশিয়ান এবং একটি বিশেষ প্রশিক্ষিত কুকুর।
এর আগে সিএনএন জানিয়েছিল, লিংকন স্ট্রাইক গ্রুপের দায়িত্বে থাকা দুই নাবিক সাম্প্রতিক মাসগুলোয় জাহাজ থেকে সাগরে পড়ে গিয়েছিলেন। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, দুজনকেই উদ্ধার করা হয়। নেভি টাইমস ও স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আরো কয়েকজন নাবিককে জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেয়া থেকে আটকানো হয়েছিল। গিলিব্র্যান্ডকে দেয়া চিঠিতেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
নানা ধরনের জল্পনার মধ্যে গত আগস্টে জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্য ছাড়ে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সান দিয়েগোতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
লিংকনে থাকা কয়েকজন নাবিক জানান, তাদের আগের মোতায়েনের তুলনায় এবারকার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। এর প্রধান কারণ ছিল যুদ্ধ, এতে রণতরীটি মিত্র দেশগুলোর বন্দরে থামতে পারেনি। এসব বন্দরে থামার সময় জাহাজে নতুন সরবরাহ নেয়া এবং নাবিকদের বিশ্রাম ও অবসর কাটানোর সুযোগ থাকে।
দেশবার্তা/এমআর